সিলেটের ওসমানীনগরের ক্যান্সার আক্রান্ত মাদ্রাসা ছাত্রী রিমার (১১) চিকিৎসার দায়িত্ব নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তার পায়ে অস্ত্রপাচারের জন্য জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় রিমাকে গতকাল রাতে ঢাকায় প্রেরণ করা হয়েছে। রিমা ওসমানীনগরের উছমানপুর ইউনিয়নের উছমানপুর গ্রামের দুদু মিয়ার মেয়ে এবং স্থানীয় পাঁচপাড়া মোহাম্মদিয়া দাখিল মাদ্রাসার চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী। সিলেটের জেলা প্রশাসক নুমেরী জামান ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ আনিছুর রহমান বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
উল্লেখ্য, গত প্রায় ছয় মাস পূর্বে দিনমজুর দুদু মিয়ার মাতৃহারা মেয়ে রিমার ডান পায়ে ক্ষত দেখা দেয়। টাকার অভাবে চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত থাকায় তার ক্ষত বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে গত প্রায় ৩ মাস পূর্বে তাকে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করে দীর্ঘ প্রায় দেড়মাস চিকিৎসা দেয়া হয়।
এসময় তার পায়ে ক্যান্সার রোগ সনাক্ত হলে রিমাকে ক্যান্সার বিভাগে ভর্তির পরামর্শ দেন চিকিৎসকরা। কিন্তু টাকার অভাবে চিকিৎসা না করিয়ে তাকে বাড়িতে আসতে হয়। এর পর থেকে সে বাড়িতে বিনা চিকিৎসায় পড়েছিল। গত ৩ সেপ্টেম্বর বালাগঞ্জ প্রতিদিন এবং ৪ সেপ্টেম্বর দৈনিক সবুজ সিলেট পত্রিকায় একই প্রতিবেদকের “ক্যান্সার আক্রান্ত মাদ্রাসা ছাত্রী রিমা বাঁচতে চায়” শিরোনামে সংবাদ প্রকাশ পেলে বিষয়টি নজরে আসে বালাগঞ্জের দেওয়ানবাজার ইউনিয়নের মোহাম্মদপুর (শংকরপুর) গ্রামের সমাজসেবী হাজী প্রয়াত সোয়াব আলীর মেয়ে যুক্তরাজ্য প্রবাসী আইনজীবি আকলিমা বিবির।
তিনি এই প্রতিবেদকের সাথে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করে অসুস্থ রিমার খোঁজ খবর নেন। এসময় রিমার চিকিৎসার জন্য তিনি ৪০ হাজার টাকা মেডিকেল খরচ দিতে আগ্রহ প্রকাশ করেন। পরবর্তীতে তিনি রিমার পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা সেবার কথা চিন্তায় এনে বিষয়টি নিয়ে প্রধানন্ত্রীর কার্যালয়ে যোগাযোগ করেন। এসময় প্রধানমন্ত্রীর একান্ত সচিব কাজী নিশাত রসুল অসহায় রিমার চিকিৎসার দায়িত্ব নেয়ার আশ্বাস দেন। এর প্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে সিলেটের জেলা প্রশাসক নুমেরী জামান ও ওসমানীনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ আনিছুর রহমানের সাথে যোগাযোগ করে অসুস্থ মেয়ের খোঁজ খবর সংগ্রহ করা করা হয়।
৯ সেপ্টেম্বর (রোববার) দুপুরে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সাবেক পরিচালক ও স্বাচিপের যুগ্ম-মহাসচিব সহযোগী অধ্যাপক ডা. জুলফিকার লেনিন রোগীর স্বজন ও ওসমানীনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান ময়নুল আজাদ ফারুকের সাথে মোবাইল ফোনে কথা বলে রোগীকে ঢাকায় প্রেরণের অনুরোধ জানান। এর প্রেক্ষিতে রিমাকে ঢাকায় পাটানোর ব্যবস্থা নেয়া হয় এবং ১১ সেপ্টেম্বর (মঙ্গলবার) বাদ সন্ধ্যা রিমাকে ঢাকার উদ্দেশ্যে সিলেট ছাড়ার বন্দোবস্ত করা হয়।
এদিকে এমন খবরে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারা রিমার দাদি আমিনা বেগম বলেন, টাকার অভাবে রিমার ডাক্তারি করাতে পারছিলাম না। বিষয়টি প্রকাশ পেলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে রিমার চিকিৎসার দায়িত্ব নেয়ায় অত্যন্ত খুশি হয়েছি। এজন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, প্রবাসী আকলিমা বিবি, সিলেটের ডিসি, ওসমানীনগরের ইউএনও, স্থানীয় চেয়ারম্যান ও সাংবাদিকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি। সবার কাছে নাতনীর সুস্থতার জন্য দোয়া কামনা করছি।
যুক্তরাজ্য প্রবাসী আইনজীবি আকলিমা বিবি বলেন, সংবাদে মাতৃহারা অসহায় মেয়েটির কথা জেনে খুব কষ্ট অনুভব করেছি। তাই রিমার পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা সেবা পাওয়ার স্বার্থে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ফোন করে যোগাযোগ করি। এরপর জানতে পারি প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে তার চিকিৎসার দায়িত্ব নেয়া হয়েছে যা শুনে আমি আনন্দিত হয়েছি। তিনি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সহ সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন। বিশেষ করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর উদার মনমানসিকতার ভূয়সী প্রশংসা করেন।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ আনিছুর রহমান বলেন, আমি রিমাদের বাড়িতে গিয়েছি। তাদের পরিবারটি খবুই দরিদ্র্য। টাকার অভাবে চিকিৎসা করাতে না পেরে মেয়েটির অবস্থা খুবই খারাপের দিকে যাচ্ছিল। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে তার চিকিৎসার দায়িত্ব নেয়া হয়েছে। মঙ্গলবার রাত ৯টার দিকে রিমা ঢাকার উদ্দেশ্যে যাত্রা করবে।
সিলেটের জেলা প্রশাসক নুমেরি জামান বলেন, অসুস্থ রিমার খোঁজ খবর নিয়েছি। প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে মেয়েটির চিকিৎসার দায়িত্ব নেয়া হয়েছে। আজ রাতেই তাকে ঢাকা পাঠানোর জন্য ব্যবস্থা নিতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে বলা হয়েছে।
এদিকে শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত রিমার পিতা ও আত্মীয়-স্বজন তাকে নিয়ে রাজধানীর উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়েছেন। এর আগে বিশেষ এক মোনাজাতের মাধ্যমে স্থানীয় এলাকাবাসীর সহযোগীতায় রাত প্রায় ৯টার দিকে ইউপি চেয়ারম্যান ময়নুল আজাদ ফারুক প্রাইভেট এ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করে রিমাকে তুলে দেন।
মোনাজাত পরিচালনা করেন উছমানপুর গায়েবী মসজিদের ইমাম হাফিজ মুজিবুর রহমান। এসময় ইউপি সদস্য মো. আতাউর রহমান, শামছুল উলামা সমাজ কল্যাণ পরিষদের সভাপতি মাওলানা কাজী আব্দুল বাছিত, উছমানপুর ইউনিয়ন পরিষদের উদ্যোক্তা মারজানুর রহমান সহ স্থানীয় এলাকাবাসী উপস্থিত ছিলেন।








