মঙ্গলবার, ৩ অগাস্ট ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ১৯ শ্রাবণ ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

রিজেন্ট হাসপাতালের অব্যবস্থাপনার কথা জেনেও ব্যবস্থা নেয়নি মন্ত্রণালয়



রিজেন্ট হাসপাতালের অব্যবস্থাপনার কথা আগেই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়ে জানিয়েছিলেন সেখানে সরকারের নিযুক্ত দুই চিকিৎসক। কিন্তু মন্ত্রণালয় কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো এই দুই চিকিৎসকের একজনকে অন্য হাসপাতালে বদলি করে দেয়। বদলির আদেশ যায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে।

গত ১৫ মে রিজেন্টের অব্যবস্থাপনা নিয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য বিভাগের সচিবকে চিঠি পাঠান সরকার থেকে নিয়োগ পাওয়া চিকিৎসক শরীফ সাম্মিরুল আলম। পরদিনই তাঁকে মুগদা জেনারেল হাসপাতালে বদলি করা হয়। ওই দিনই তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানের (নিটোর) চিকিৎসক আশরাফুল আলম। ২৩ মে তিনিও অব্যবস্থাপনার কথা জানিয়ে সচিবকে চিঠি পাঠান। ৬ জুলাই র‍্যাবের অভিযানের দিন পর্যন্ত তিনি সেখানেই কর্তব্যরত ছিলেন।

করোনার নমুনা পরীক্ষা না করে ভুয়া রিপোর্ট তৈরি, বিনা মূল্যে চিকিৎসা দেওয়ার কথা থাকলেও রোগীপ্রতি লক্ষাধিক টাকা বিল আদায় এবং টাকার বিনিময়ে কোভিড পরীক্ষার অভিযোগে রিজেন্ট হাসপাতালে অভিযান চালিয়ে বন্ধ করে দেয় র‍্যাব। হাসপাতালের চেয়ারম্যান সাহেদ করিমকে সাতক্ষীরার সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে বুধবার ভোরে গ্রেপ্তার দেখায় র‍্যাব। পরদিন সাহেদকে জিজ্ঞাসাবাদে ১০ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত। ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করছে।

জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের আইসিইউ (নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্র) কনসালট্যান্ট শরীফ সাম্মিরুল আলম স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে গত ১১ মে রিজেন্ট হাসপাতালে যোগ দিয়েছিলেন। ১৫ মে তৎকালীন সচিব আসাদুল ইসলাম বরাবর পাঠানো চিঠিতে তিনি জানান, হাসপাতালে যোগ দেওয়ার শুরুতেই তিনি আইসিইউর চারটি বেডে কোভিড পজিটিভ মুমূর্ষু রোগী ভর্তি দেখতে পান। কিন্তু আইসিইউর কেন্দ্রীয় অক্সিজেন লাইন ও তিনটি ভেন্টিলেটর ত্রুটিপূর্ণ। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করে সেটি মেরামত করে দায়িত্ব পালন শুরু করেন। আইসিইউ পরিচালনার জন্য একজনও দক্ষ জনবল ছিল না। জরুরি ভিত্তিতে কোভিড পরীক্ষা করারও কোনো ব্যবস্থা নেই। ওষুধ ও সুরক্ষাসামগ্রীর ঘাটতি ছিল তীব্র।

চিঠিতে শরীফ সাম্মিরুল আলম আরও উল্লেখ করেন, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে তিনি তৎক্ষণাৎ একটি চাহিদাপত্র দেন। কর্তৃপক্ষ তাঁকে দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে প্রয়োজনীয় উপকরণ ও জনবল সরবরাহের আশ্বাস দেয়। কিন্তু সেই উপকরণ ও জনবল না পাওয়ায় আবারও হাসপাতালের চেয়ারম্যানকে জানালে তিনি তাঁকে হুমকি দেন ও ভয় দেখান এবং খুব বাজে ব্যবহার করেন।

শরীফ সাম্মিরুল আলম গতকাল শুক্রবার মিডিয়াকে বলেছেন, এই চিঠি দেওয়ার এক দিন পরই স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে বদলির আদেশ আসে। তাঁকে মুগদা হাসপাতালে কোভিড চিকিৎসায় পাঠানো হয়। এখন তিনি সেখানেই কাজ করছেন।

সাম্মিরুল আলমের পর হাসপাতালটিতে যোগ দেন নিটোরের চিকিৎসক আশরাফুল আলম। ২৩ মে সচিবকে তিনি প্রায় একই চিঠি পাঠান। সেখানে তিনি আগের সমস্যার পাশাপাশি এ-ও উল্লেখ করেন, হাসপাতালটিতে জরুরি কোভিড রোগী পরীক্ষা করানোর কোনো ব্যবস্থা নেই। পরীক্ষার নমুনা বাইরে পাঠাতে হয় এবং রিপোর্ট আসতে যথেষ্ট দেরি হয়। এ অবস্থায় রোগী আরও আশঙ্কাজনক অবস্থায় চলে যায়।

আশরাফুল আলম গতকাল মিডিয়াকে চিঠি দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। ৬ জুলাই রিজেন্ট হাসপাতালে র‍্যাবের অভিযানের পর হাসপাতালটি বন্ধ হয়ে গেলে তাঁকে লাল কুঠি মিরপুর হাসপাতালে কোভিড চিকিৎসায় পাঠানো হয়েছে। চিঠির বিষয়ে তিনি বিস্তারিত বলতে অস্বীকৃতি জানান।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এই দুই চিকিৎসকের একজন বলেন, দুজন চিকিৎসক চিঠি পাঠানোর পরও পরিস্থিতির উন্নয়নে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি কর্তৃপক্ষ। তাঁদের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে কর্তৃপক্ষ হাসপাতালটি পরিদর্শনে গেলে অনিয়মগুলো আগেই ধরা পড়ত।

দুই চিকিৎসক যখন রিজেন্ট হাসপাতালের অব্যবস্থাপনা নিয়ে চিঠি পাঠান, তখন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিবের দায়িত্বে ছিলেন মো. আসাদুল ইসলাম। করোনাভাইরাস মোকাবিলায় স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের ভূমিকা নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনার মধ্যে গত ৪ জুন তাঁকে বদলি করে পরিকল্পনা বিভাগের সচিব করা হয়েছে। চিঠির বিষয়ে জানতে গতকাল তাঁকে বেশ কয়েকবার ফোন দেওয়া হলেও তিনি ধরেননি। খুদে বার্তায় পরিচয় দিয়ে কথা বলার অনুমতি চেয়েও সাড়া পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবুল কালাম আজাদের বক্তব্য জানতে গতকাল বিকেলে বারবার ফোন দেওয়া হলেও সংযোগ পাওয়া যায়নি।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মুখপাত্র আয়েশা আক্তার বিষয়টি নিয়ে অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক) আমিনুল হাসানের সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন। কিন্তু আমিনুল হাসানও ফোন ধরেননি।

শেয়ার করুন:

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

error: Content is protected !!