মঙ্গলবার, ১৯ অক্টোবর ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ৪ কার্তিক ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

আব্দুর রশীদ লুলু

চাষাবাদ বিষয়ক টুকিটাকি



 সহজ প্রাচ্য, পুষ্টিকর ও উপাদেয় ফল কলা প্রায় সব ধরণের মাটিতে চাষাবাদ সম্ভব হলেও উর্বর দোআঁশ মাটিতে এর ফলন ভালো হয়। কলা চাষাবাদের  জন্য আর্দ্র ও গরম আবহাওয়া দরকার। মাটিতে রস থাকে অথচ পানি জমে না এমন জায়গায় কলা লাগাতে হয়। কলার উচ্চ ফলনশীল জাত হলো- জায়ান্ট গভর্ণর, রোবাষ্টা প্রভৃতি। দেশি জাতের মধ্যে আছে- চাঁপা, বর্তমান, অমৃত সাগর, কাঁঠালি প্রভৃতি। অতি গরম, অতি বৃষ্টি ও অতি শীতের সময় ছাড়া বছরের যে কোনো সময় কলা গাছের চারা লাগানো যেতে পারে। চাষাবাদ সংশ্লিষ্ট অনেকে বলেন, চাষাবাদের জন্য নির্বাচিত চারা তুলে ২/৩ দিন ছায়ায় রেখে নির্দিষ্ট স্থানে লাগালে ভালো হয়। কলা চাষাবাদের জমিতে যাতে আগাছা, ইট-পাথর এবং পলিথিন জাতীয় কিছু না থাকে সেদিকে সযত্ম দৃষ্টি রাখতে হবে। এ ছাড়া ডিসেম্বর-এপ্রিল পর্যন্ত সময়ে বৃষ্টিপাতে না হলে মাঝে মাঝে সেচ প্রদান করলে কলা গাছের বাড়-বাড়ন্ত বেশি হবে, মোচা তাড়াতাড়ি আসবে এবং ফল হৃষ্টপুষ্ট
হবে।

 ভিটামিন-এ, লোহা, ফসফরাস ও ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ গোলাপ জাম চাষাবাদের জন্য শুষ্ক ও উষ্ণ আবহাওয়া উপযোগি। এর চাষাবাদ দোআঁশ ও পলি দোআঁশ মাটিতে পুকুর, খাল ও নদীর ধারে ভালো হয়। সাধারণত: বীজ থেকেই বংশ বিস্তার/চারা উৎপাদন করা হয়। তবে গুটি কলম ও জোড় কলমের মাধ্যমেও চারা লাগানো যেতে পারে। আমাদের দেশে গোলাপ জামের উন্নত জাত নেই। তবে প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা মতে, সিঙ্গাপুর ও মালয়ে এর উন্নত জাত রয়েছে। ফল দেয়া শেষ হলে শুকনো ও অপ্রয়োজনীয় ডালপালা ছেঁটে দিলে (বছরে একবার) গাছ সতেজ হয় এবং পরবর্তী বছরে ভালো ফলন দিয়ে থাকে। উল্লেখ্য, ভালো ফলনের জন্য গাছে উপযুক্ত পরিচর্যাও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

 দো-আঁশ, বেলে দো-আঁশ ও কাঁকর মাটিতে উৎপাদন ভালো হয় এমন একটি চমৎকার ফল আতা, যা স্বাদে-গন্ধে প্রায় অতুলনীয়। আতা গাছ অনেকটা অযত্নে-অবহেলায় যত্রতত্র চাষাবাদ করা যায়। গাছের পাতা তেতো বলে গরু-ছাগলে এ গাছের তেমন অনিষ্ট করে না। শুষ্ক অঞ্চলের পাহাড়েও এর চাষাবাদ সম্ভব বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। আতা গাছের চারা লাগানোর ভালো সময় আষাঢ়-শ্রাবণ মাস। সেচ সুবিধা থাকলে বর্ষাকাল ছাড়াও সারা বছর চারা লাগানো যেতে পারে। বীজ থেকেই সাধারণত চারা উৎপাদন করা হয়। তবে ইদানিং চোখ কলমের মাধ্যমেও বংশ বিস্তার করা হচ্ছে। বীজ থেকে চারা গজাতে ৩০-৪৫ দিন সময় লাগে। বীজের গাছে ফল আসতে ৫/৬ বছর সময় লাগে। তবে উপযুক্ত পরিচর্যায় এক আধ বছর আগেও ফল আসতে দেখা যায়। বাণিজ্যিকভাবে চাষাবাদের জন্য আতা গাছের সারি থেকে সারির দূরত্ব এবং গাছ থেকে গাছের দূরত্ব হবে ১৮-২০ ফুট। উল্লেখ্য, আতা ক্যালসিয়াম, ভিটামিন
ও অন্যান্য খনিজ সমৃদ্ধ একটি ফল। বাজারে দুষ্প্রাপ্য; অথচ চাহিদা সম্পন্ন একটি ফল হওয়ায় এর চাষাবাদ লাভজনক। এ ছাড়া এর পাতা, ছাল ও শিকড়েও ভেষজগুণ বিদ্যমান।

 অপ্রধান তবে ক্রমে জনপ্রিয় হচ্ছে এমন একটি জলজ ফল-পানি ফল। মিঠা পানিতে উষ্ণ ও আর্দ্র আবহাওয়ায় পানি ফল ভালো চাষাবাদ হয়ে থাকে। বাজারে প্রচুর চাহিদা সম্পূন্ন পানি ফলের দু’টি জাত হলো- চাপড়াই দেশি ও জংলী। চাষাবাদ সংশ্লিষ্টদের ধারণা চাপড়াই জাতই সেরা। এ জাতে ফলন বেশি হয়। এছাড়া আকারে বড় ও স্বাদে ভালো। উল্লেখ্য, পানি ফলে ভিটামিন ‘এ’, ‘সি’ এবং ক্যালসিয়াম বিদ্যমান। এর শাঁস সিদ্ধ করে ও কাঁচা অবস্থায় খাওয়া ছাড়াও পিঠা ও তরি-তরকারিতে বহুভাবে ব্যবহৃত হয়। সাধারণত পুরানো ঝাড় সমূলে তুলে নিয়ে নির্ধারিত জায়গায় রোপণের মাধ্যমে পানি ফলের চাষাবাদ বিস্তার করা হয়। এ ছাড়া ডিসেম্বর মাসের দিকে পরিপক্ক পানি ফল তুলে নিয়ে নির্দিষ্ট জায়গায় বপণ করেও চাষাবাদ করা যায়। অনেক সময় আপনা আপনিও পরিপক্ক ফল ঝরে পড়ে নতুন গাছ জন্মায়। জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারির দিকে নতুন গাছ জন্মাতে দেখা যায়। রোপণের/চারা গজানোর ১০০-১১০ দিনের মধ্যে গাছ থেকে ফল সংগ্রহ করা যায়। অক্টোবর থেকে নভেম্বরে বেশি পরিমাণে পানি ফল উত্তোলন করা যায়। যত্নসহকারে চাষাবাদে হেক্টর প্রতি ১০-১২ টন ফলন পাওয়া যেতে পারে। উল্লেখ্য, পানি ফলের আকার দেখতে অনেকটা সিঙ্গারার মতো হওয়ায় অনেকে এটাকে সিঙ্গারা ফলও বলে থাকেন।

 যে কোনো ধরণের মাটিতেই চাষাবাদ করা যায় কামরাঙ্গা ফল। তবে উর্বর দো-আঁশ ও পলি মাটিতে এর চাষাবাদ ভালো হয়। এ ছাড়া উষ্ণ ও আর্দ্র জলবায়ু কামরাঙা গাছের জন্য উপযুক্ত। মিষ্টি ও টক এ দুই ধরণের কামরাঙ্গা রয়েছে। এ গাছ ১৫-২০ ফুট লম্বা হয়ে থাকে। বীজের চারা ছাড়াও দাবা কলম, জোড় কলম ও গুটি কলমের মাধ্যমে কামরাঙ্গার বংশ বিস্তার করা হয়। উপযুক্ত পরিচর্যায় ২/৩ বছরে এ গাছে ফল আসতে শুরু করে। কামরাঙ্গা গাছ সাধারণত: বছরে দু’বার (পৌষ-মাঘ এবং ভাদ্র-আশ্বিন) ফল দিয়ে থাকে। কোনো কোনো গাছ আবার সারা বছরই ফল দেয়। উল্লেখ্য, পাতা ও ফল সমৃদ্ধ কামরাঙ্গা গাছ দেখতে খুবই সুন্দর। এ ছাড়া এ ফলে ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, ফসফরাস ইত্যাদি খনিজ উপাদান রয়েছে।

 উষ্ণ ও গ্রীষ্ম প্রধান জলবায়ু বিদ্যমান এলাকায় কালোজাম ভালো চাষাবাদ হয়। রক্ত পরিস্কারক এ ফল দেশে সাধারণত বাণিজ্যিক/পরিকল্পিত চাষাবাদ হয় না। অপরিকল্পিতভাবে হেলা-ফেলায় অন্য গাছের সাথে চাষাবাদ হয় মাত্র। তবে কালোজাম দেশের সবখানেই চাষাবাদ সম্ভব। উঁচু ও মাঝারি উঁচু জমির দো-আঁশ ও পলি দো-আঁশ মাটি কালো জামের উপযোগী হলেও দেশের নিম্ন জমিতে (যেখানে প্রায়ই ৪/৫ মাস পানি থাকে) ও সকল প্রকার মাটিতে কালো জামের চাষাবাদ হতে দেখা যায়। কালো জাম বিভিন্ন আকারের ও স্বাদের রয়েছে। চারা উৎপাদনের জন্য আষাঢ়-শ্রাবণ মাসে ভালো জাতের পাকা বীজ সংগ্রহ করে লাগাতে হয়। ফল সংগ্রহ শেষে (বছরে একবার) শুকনো ও অপ্রয়োজনীয় ছোট ডালপালা ছেঁটে দেয়া ভালো।

 সুস্বাদু, খনিজ উপাদান সমৃদ্ধ ও ভিটামিনযুক্ত ফল ডালিম চাষাবাদের জন্য হাল্কা দো-আঁশ ও পলি দো-আঁশ মাটি উপযুক্ত হলেও অনুর্বর জমিতেও চাষাবাদ করা যেতে পারে। প্রচন্ড খরা সহিষ্ণু ডালিম চাষাবাদের জন্য সাধারণত: বীজ থেকে চারা উৎপাদন করতে হয়। তবে গুটি দারা ও জোড় কলম করেও চাষাবাদ করা যেতে পারে। উপযুক্ত পরিচর্যায় ৪/৫ বছরে গাছে ফুল-ফল এসে থাকে।

 লেখক: সম্পাদক-  আনোয়ারা (শিকড় সন্ধানী প্রকাশনা), সিলেট

শেয়ার করুন:

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

error: Content is protected !!