মঙ্গলবার, ৩ অগাস্ট ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ১৯ শ্রাবণ ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

আব্দুর রশীদ লুলু

মরহুম মো. তফজ্জুল আলী: অনুভবে অনুভূতি



 

মরহুম মো. তফজ্জুল আলী

১৯ জুলাই (২০১৮) বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত এগারো ঘটিকার দিকে যখন লেখার টেবিলে মনোযোগী হওয়ার চেষ্টা করছি তখন সেলফোন বেজে উঠে। সেইভ নাম দেখেই আঁৎকে উঠি, নিশ্চয় খারাপ কিছু। রিসিভ করতেই মামাতো ভাই এনামের কন্ঠ- ভাইয়া, আব্বা মারা গেছেন। ইন্নালিল্লাহ …… পড়ে খানিকক্ষণ চুপচাপ বসে থাকি। মনে মনে আওড়াই- ‘একে একে নিভেছে দেউটি’। আমার মেঝ মামা (মা’র আপন বড় ভাই) শ্রদ্ধেয় মো. তফজ্জুল আলী বেশ কিছুদিন থেকে অসুস্থ, স্থানীয় একটি ক্লিনিকে চিকিৎসাধীন। সে খবর আমি জানতাম। নিয়মিত সেলফোনে মামাতো ভাই ডা. এনামুল হক এনামের মাধ্যমে খবরাখবর নিতাম। ২/১ দিন ক্লিনিকে দেখতেও গিয়েছিলাম। কিন্তু আইইউসি-তে থাকায় সরাসরি দেখা হয়নি।

উল্লেখ্য, ব্লগের জনপ্রিয় লেখক ও সিলেট ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের কমিউনিটি মেডিসিন বিভাগের তরুণ প্রভাষক ডা. এনামুল হক এনাম আমার মেঝ মামার ছোট ছেলে। মামার অপর সন্তানেরা হচ্ছেন যথাক্রমে- মুকুল ইকবাল (ইংল্যান্ড প্রবাসী কবি), শামসুল হক বেলাল (কানাডা প্রবাসী সাবেক ছাত্রলীগ নেতা) এবং আনোয়ারুল হক হেলাল (ইংল্যান্ড প্রবাসী সাবেক ছাত্রলীগ নেতা)। চার জনই প্রতিষ্ঠিত। আমার প্রায়ই মনে হতো, এদিক দিয়ে মামা সুখি ছিলেন, সন্তানদের অন্ন-বস্ত্রের চিন্তা তাঁকে স্পর্শ করতে পারেনি।

সে রাতে আর লেখা হয়নি কিছু, শুয়ে বসে ঘুরে ফিরে মামার কথা-স্মৃতি বিচ্ছিন্নভাবে মনে পড়ে। মনে মনে বলি, মামার বাড়ির দরজা বুঝি বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। ধুলি-কাদা নিয়ে যখন-তখন মেঝ মামার বিশাল বিল্ডিং-এ ঢুকে পড়েছি। কখনো দ্বিধা স্পর্শ করেনি। যেখানে অন্যখানে প্রবেশাধিকার না পাওয়ায় অনেক দিন চৌকাঠ না মাড়িয়েই ফিরে এসেছি। আমি আমার মেঝ মামা, মামী এবং তাঁদের সন্তান এমনকি তাঁদের পুত্রবধুঁদেরও কাছে অনেক ঋণী। কেউ কেউ হয়তো কপাল কুচকাতে পারেন। ভাবছি, আত্মীয়-স্বজন সবার ঋণ- অঋণ আর সব আচার-আচরণের কথা লিখে যাব। পঞ্চাশ পেরিয়ে এখন চিন্তার কথা, সময়তো অনেক বয়ে গেছে। লেখালেখিতে গতি ও সময় বাড়াতে হবে এবং জলদি করতে হবে- ‘এখনই সময় সামনে এগিয়ে যাওয়ার’।

গ্রামে সাধারণ মানুষ ও মাটি-কাদার সাথে গড়াগড়ি করতে গিয়ে মামার বাড়ি বা শহরে আমার সময় খুব একটা কাটানো হয়নি। হয়তো শহরের বিলাসিতা/আভিজাত্য/চাকচিক্য আমাকে টানেনি; বরং মাটি আর সাধারণ মানুষ তথা সাধারণ জীবনযাপনই আমার প্রিয়। মামার জীবদ্দশার শেষ দিনগুলোতে ২/৩ বছর যাওয়া হয়নি। শুনেছি, মামা নাকি মৃত্যুর কয়েকদিন আগেও বাসায় বলাবলি করেছিলেন- লুলু আসে না। যা হোক, আমার মেঝ মামা সিলেটের ওসমানীনগর উপজেলার ঐতিহ্যবাহী মাধবপুর গ্রামে ৩ মার্চ ১৯৩৭-এ এক সমৃদ্ধ গৃহস্থ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। এবং স্বাধীনতা পরবর্তী সময় থেকে সিলেট শহরের সাগরদিঘীর পূর্ব পাড়ে দাপটের সঙ্গে বসবাস করে আসছিলেন। মামা তাঁর প্রতিভা ও পরিশ্রমের গুণে স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে একক প্রচেষ্টায় সাধারণ জীবন থেকে একটা উন্নত ও স্বচ্ছল জীবন অর্জন করেছিলেন। অন্যান্য বিষয়ের সাথে মামা কৃষি কর্মকে খুবই পছন্দ করতেন। গভীর রাতেও দেখা যেত মামা কৃষি নিয়ে আছেন। আমি যতদূর দেখেছি, আমার নানা মরহুম আলহাজ্ব মছলন্দ আলীও কৃষিকে ভালোবাসতেন। অবশ্য কেউ কেউ বলেন, নানা এবং মেঝ মামার কৃষিপ্রীতি আমার মাঝে কিছুটা সঞ্চারিত হয়েছে। বলা বাহুল্য, ২০০৯ সালের জানুয়ারি থেকে বিশেষ আগ্রহ নিয়ে আমি কৃষি কর্ম শুরু করলেও অদ্যাবধি এ ক্ষেত্রে সাফল্য খুব কমই ধরা দিয়েছে। তবুও ‘লুলু সেন্টার’-এ অন্যান্য বিষয়ের সাথে কৃষি আছে, থাকবে ইনশাআল্লাহ।

উল্লেখ্য, নানার কৃষিকর্ম ও ঘর-গেরস্থালী প্রায় চার বছর আমি কাছে থেকে দেখেছি। মেঝ মামার কাজ কাছে থেকে দূরে থেকে অবলোকন করেছি। ইচ্ছা ছিল একদিন কৃষি নিয়ে মামার সাথে বিস্তারিত কথা বলব। কিন্তু সে আর হয়নি। মামার বাসা সত্যিকার অর্থে ভিলা (বাগান বাড়ি) ছিল। অনেক দিন ভেবেছি, মামাকে বলব- মামা ‘আলী মঞ্জিল’-এর পরিবর্তে আপনার বাসা-বাড়ির নাম ‘আলী ভিলা’ হলে মন্দ হয় না। মামার বাসা-বাড়িতে ঢু মারলেই সবুজের সমারোহ। সাথে হাঁস-মুরগ, মাছ, গরু-ছাগল, টিয়া-ময়না সব মিলিয়ে যেন সমন্বিত এক কৃষি খামার। ‘চাষাবাদ’ সম্পাদক কৃষিপ্রেমী আনিসুল আলম নাহিদ সে বাসা-বাড়ির কথা খুব বলাবলি করে- ভেতরে ঢুকলে মনে হয়, শহর না গ্রাম। মামা গ্রামের বাড়িতেও প্রচুর গাছ লাগিয়েছেন। হোমিওপ্যাথির প্রতিও মামার অনুরাগ ছিল। আমাদের পারিবারিক প্রতিষ্ঠান আনোয়ারা হোমিও হল এর খোঁজ খবরও মামা প্রায়ই নিতেন। রমজান মাসে দেখা হলে মামা আমাকে প্রায়ই পাঁচশত টাকা দিতেন। বিশ/ত্রিশ বছর আগে যেমন পাঁচশত টাকা দিতেন, এই ক’বছর আগেও তেমনি পাঁচশত টাকা দিয়েছেন। না আনতে চাইলে রাগ করতেন। দেখা হলে মামা প্রায়ই আমাদের বাড়ির লোকজনের খোঁজ-খবর নিতেন। এক সময় আমাদের বাড়িতে মামার বেশ যাতায়াত ছিল। দাড়ি রাখার পর ২/১ বার তিনি আমাকে শ্বশুড় সম্বোধন করেন। মামা স্বস্ত্রীক হজ্জ সম্পন্ন করেছেন এবং আমার দেখা মতে, নিয়মিত নামাজ পড়তেন ও রোযা রাখতেন কিন্তু ধর্ম নিয়ে কখনো বাড়াবাড়ি করতেন না। আমার মেঝ মামা অনেক পরিশ্রমী ছিলেন। দেশে-বিদেশে ছুটাছুটি করেছেন, বিচিত্র বিষয়ে ব্যবসা করেছেন এবং শেষ পর্যন্ত আল্লাহর রহমতে সম্পদশালী বাবার সম্পদ ছাড়াই সিলেট শহরে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছেন।

ধুলো-বালি নিয়ে আমি যেমন যখন-তখন মামার বিশাল বিল্ডিং-এ ঢুকেছি, তেমনি অন্যান্য আত্মীয়-স্বজনদেরও ছিল অবাধ যাতায়াত। মামাতো ভাই ডা. এনাম যেমন ছোটবেলা/ছাত্র জীবনে লেখাপড়া রেখে আমাকে চা-নাস্তা, ভাত-তরকারি রেঁধে খাইয়েছে, তেমনি এখন প্রতিষ্ঠিত হয়েও প্রয়োজনে নিজ হাতে রেঁধে খাওয়ায়। সত্যি, আমি আমার মেঝ মামা, মামী এবং মামাতো ভাইদের (বোন নেই) কাছে অনেক ঋণী। এ প্রসঙ্গে মনে পড়ছে আমার এক আত্মীয়ার কথা। ইন্টারমিডিয়েট পাশ করে যাচ্ছেন দেশের বাইরে। খুব সম্ভব ভালো রিজাল্টের গুণে বৃত্তি নিয়ে নয়, বড়লোক বাবার টাকার গুণে। আরেক আত্মীয়ার অনুরোধে যাবার আগের দিন গেলাম দেখা করতে। গিয়ে দেখি, বাসার সামনে পায়চারি করছেন এবং সম্ভবত গাড়ির জন্য অপেক্ষা করছেন। বিদেশ যাওয়ার আগে রীতিমত বিদেশীনি, অন্তত পোষাক-আষাকে। চেহারা মোবারক-এর পরিবর্তে তিনি আমাকে পাছা প্রদর্শন করেন অর্থাৎ আমাকে দেখেই ঘুরে দাঁড়ালেন। পাছা দর্শনে আমি মুগ্ধ-অভিভূত হওয়ার চেষ্টা করি এবং সৌজন্যমূলক দু’একটি কথা বলার চেষ্টা করি কিন্তু গরবিনী কোনো কথা বলেন না।

একেই বলে বড়লোক! অথচ হয়তো খোঁজ নিলে জানা যাবে, শহরের বহুতল ভবনে সদ্য বাস করা এই তরুণীর বাপ-দাদা গ্রামের ধুলো-কাদায় গড়াগড়ি দিয়েছেন অনেকের মতো এই সেদিনও। আমি মনে মনে আওড়ালাম- কিছু কিছু মানুষ দিনে দিনে এতো বড়লোক হচ্ছে যে, শিকড় ভুলে যাচ্ছে, রক্ত সম্পর্ক ছিন্ন করছে। ব্যক্তিগতভাবে আমার এটা খুবই অপছন্দ। আমি প্রায়ই আমার বউ-বাচ্ছা এবং নিকটজনদের বলি, এতো বড়ো হয়ে কাজ নেই যা শিকড় ভুলিয়ে দেয় এবং রক্ত সম্পর্ক ছিন্ন করে। আমি আমার ‘উত্তরসূরীদের খোলা চিঠিঁ’তে অন্যান্য বিষয়েরও সাথে এ বিষয়টিও লিখেছি। এ প্রসঙ্গে ‘আনোয়ারা’য় প্রকাশিত আমার সমসাময়িক আবু সাঈদ রাউফীর কবিতা মনে পড়ছে- “পায়ের তলের মাটি আহা/উঠবে বুকের উপরে/ফুল শয্যার ঐ শরীর খানা/থাকবে মাটির উদরে/ অন্ধকারে পড়ে রবে/ শত শত যুগ/ কেউ রাখবে না কোন খবর/ করবে না কেউ খোঁজ।” মাটিতেই যখন শেষ শয্যা, তখন আর মাটি আর মাটির মানুষকে কেন এতো অবেহলা? যাহোক আমার মেঝ মামা প্রচুর ধন-সম্পদের মালিক হলেও খুব সম্ভব খুব বড়লোক হননি। তাঁর দাফন-কাফনে মানুষের স্বত:স্ফুর্ত অংশগ্রহণ আমাকে মুগ্ধ করেছে।

পরদিন বাদ জুম্মা নবগ্রাম শাহী ঈদগাহ মাঠে মামার জানাযার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। বহুলোক সে জানাযায় অংশ গ্রহণ করেন। জানাযা পূর্ব বয়ানে মরহুমের পরিবার ও আত্মীয়-স্বজনের এলাকায় সমাজ কর্মে অবদানের কথা শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করা হয়। অত:পর ঈদগাহ সংলগ্ন তাঁদের পারিবারিক গোরস্থানে সসম্মানে তাঁকে কবর দেয়া হয়। যেখানে আগে থেকেই তাঁর মা-বাবা, বোন, চাচা-চাচী, ফুফুসহ অনেক আত্মীয়-স্বজন চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন। জীবনের প্রয়োজনে সবাই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকলেও চিরনিদ্রায় সবাই একত্রিত হচ্ছেন এটা অনেকেরই ভাগ্যে জুটে না। আমার মেঝ মামা এবং তাঁর আত্মীয়-স্বজনরা এক্ষেত্রে নিশ্চয় অনেক ভাগ্যবান। আমার মা যিনি অকালে বিগত শতকের ষাটের দশকে ইন্তেকাল করেছেন, তিনিও আছেন তাঁর মা-বাবা, ভাই, চাচা-চাচী ও আত্মীয়-স্বজনের সাথে। মামার মৃত্যুর পর আমার প্রায়ই মনে হচ্ছে, আজ যদি আমার মা বেঁচে থাকতেন তাহলে তিনি তাঁর বড় ভাইয়ের মৃত্যুতে কী করতেন? অথবা আমার মা যখন অকালে একটি মাত্র ছোট্ট সন্তান রেখে মারা গেলেন, তখন এই মামাইবা কী করেছিলেন? মরহুম মামা আমার সম্পর্কে প্রায়ই বলতেন, কাউকে তেমন জ্বালাতন না করে দূরে থেকে থেকে আমি নিজে নিজে প্রতিষ্ঠিত হয়েছি। মামা আমার সম্পর্কে এ রকম আশাবাদ ব্যক্ত করলেও আমি তো জানি, কত ভুলে ভরা আমার এ জীবন। মামার স্মরণে ব্যতিক্রমী একটা কিছু করার আমার প্রস্তাবে ডা. এনাম জানালো কিছু গাছ লাগানো/বিতরণ করা যেতে পারে, যেহেতু তিনি সারা জীবন গাছই লাগিয়েছেন। আমার অনুরোধ, সে গাছ হোক সব ফলগাছ। অপুষ্টির এ দেশে যে কেউ এবং পাখ-পাখালি খাবে এবং সদকায়ে জারিয়া হিসেবে বলবৎ থাকবে। উল্লেখ্য, আনোয়ারা ফাউন্ডেশন থেকে তাঁর স্মরণে একটা কিছু করার কথা আমরাও ভাবছি।

সবশেষে বছর কয়েক আগে মামার সাথে এক টৈবিলে দুপুরের খাবার খেয়েছি, তিনি সযত্নে গোশতের টুকরো গুলো দেখে দেখে আমার পাতে তোলে দিয়েছেন। জীবনে আমার ছোট-খাট দু’একটা আবদারও তিনি রেখেছেন। দূরে থেকে বরাবরই তাঁকে শ্রদ্ধা জানিয়ে এসেছি মৃত্যু পরবর্তীতেও তেমনি শ্রদ্ধা নিবেদন করছি, আল্লাহ্ তাঁকে কবরের জীবনে শান্তিতে রাখুন।

লেখক, সম্পাদক আনোয়ারা (শিকড় সন্ধানী প্রকাশনা)।

শেয়ার করুন:

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

error: Content is protected !!