শুক্রবার, ২১ জানুয়ারী ২০২২ খ্রিস্টাব্দ | ৮ মাঘ ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

আজ বালাগঞ্জ মুক্ত দিবস



ছবি: এগৃহ ১৯৭১ সালের ৭ই ডিসেম্বর পাক বাহিনী হাত থেকে রক্ষা করে অস্ত্র ও মুক্তিযোদ্ধাদের অফিস কক্ষ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিলো।

আজ ৭ ডিসেম্বর। ১৯৭১ সালের আজকের এই দিনে পাক হানাদার মুক্ত হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক কর্ণেল এম এ জি ওসমানীর পৈত্রিক নিবাস অবিভক্ত বালাগঞ্জ থেকে। এদিন বীর মুক্তিযোদ্ধা আজিজুল কামালের নেতৃত্বে মুক্তিবাহিনীর একটি দল বালাগঞ্জ থানা দখল করে।

জানা যায়, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ১৯৭১ সালের ২ ডিসেম্বর সকাল ৬টায় ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের রাতাছড়া থেকে ৪০ জন মুক্তিযোদ্ধা বালাগঞ্জের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন। বীর মুক্তিযোদ্ধা আজিজুল কামালের নেতৃত্বে এ বাহিনীর অন্যান্য সহযোদ্ধা হিসেবে ছিলেন মুছব্বির বেগ, শফিকুর রহমান, মনির উদ্দিন, ধীরেন্দ্র কুমার দে, নীহারেন্দু ধর, আব্দুল খালিক, জবেদ আলী, সিকন্দর আলী, আমান উদ্দিন, লাল মিয়া, মনির উদ্দিন আহমদ, মজির উদ্দিন আহমদ, মো. সমুজ আলী, আব্দুল বারী প্রমুখ।

এদের মধ্যে ২৬ জন পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী পথে মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলা সদরে থেকে যান। বাকী ১৪ জনের দলটি ৪ ডিসেম্বর সন্ধ্যার পর অধিনায়ক আজিজুল কামালসহ ফেঞ্চুগঞ্জ থানার মাইজগাঁও এলাকার আব্দুল গণি মাস্টার ও বদরুল হক নিলুর বাড়ীতে উঠেন। সেখান থেকে একই রাত ১২ টার সময় রওয়ানা হয়ে রাত ২ টার সময় ইলাশপুর রেল সেতুর নিকট অবস্থান করেন। পরদিন ভোরে একদল পাক সেনা সিলেট থেকে ফেঞ্চুগঞ্জের দিকে অগ্রসর হলে মুক্তিবাহিনীর সাথে মুখোমুখি হয়।

সেখানে প্রায় অর্ধঘন্টা যুদ্ধ চলে। পাকিস্তানী সৈন্যরা শেষ পর্যন্ত ২টি এসকেএস রাইফেল ও বেশ কিছু গোলাবারুদ ফেলে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। এরপর, মুক্তিযোদ্ধারা ইলাশপুর সেতু অতিক্রম করেন। এ সময় বড়লেখা থেকে ২৬ জনের দলটিও সেখানে এসে পৌঁছে যায়। এতে উভয় দলের মনোবল আরো বেড়ে যায়।মুক্তিযোদ্ধারা ইলাশপুর সেতুর অবস্থান থেকে ৬ ডিসেম্বর ভোর রাতে রওয়ানা হয়ে সন্ধ্যা ৭টার সময় প্রায় ১২ কিলোমিটার দূরে বর্তমান বালাগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কাছে পৌঁছতে সক্ষম হন। এরপর, সেখানে অবস্থান করে শুরু হয় তথ্য সংগ্রহের পালা। সংবাদ পাওয়া যায়, বালাগঞ্জ থানায় পাক হানাদার বাহিনী নেই, তবে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আুল জব্বারের নেতৃত্বে একদল বাঙ্গালী পুলিশ রয়েছে। সেদিন রাজশাহীর বদিউজ্জামান, বিয়ানীবাজারের ডা. জাকারিয়া ও কাজীপুরের আব্দুছ সুলতান বার্তা বাহকের কাজ করেন। ইতোমধ্যে রাত নেমে আসে। রাতেই মুক্তিযোদ্ধারা থানা ভবনে অবস্থানকারী পুলিশ বাহিনীকে ঘেরাও করে ফেলেন।

৭ ডিসেম্বর সকালে বার্তা বাহক দুই জনকে দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষ থেকে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার নিকট আত্মসমর্পণের নির্দেশ পাঠানো হয়। পুলিশ বাহিনী তখন দুই ঘণ্টা সময় প্রার্থনা করে। কিন্তু অধিনায়ক আজিজুল কামাল ঘোষণা করেন বড়জোড় ১০মিনিট সময় দেওয়া যেতে পারে। অতঃপর সিদ্ধান্ত হয় পাক হানাদারের ওই দোসররা সকাল ৯ টায় অস্ত্র সমর্পণ করবে। এই সিদ্ধান্ত মোতাবেক পুলিশ বাহিনী থানা ভবনের মালখানায় অস্ত্র জমা দেয় এবং ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সকাল পৌনে ১০টায় মুক্তি বাহিনীর অধিনায়কের নিকট চাবি হস্তান্তর করে। এ সময় এলাকার মুক্তিকামী শতশত মানুষের হর্ষধ্বনীতে প্রকম্পিত হয়ে উঠে বালাগঞ্জ। পাকিস্থানি পতাকা নামিয়ে পুড়িয়ে ফেলে থানায় স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হয়। উপস্থিত শত শত জনতা মুক্তিবাহিনীকে বালাগঞ্জে স্বাগত জানায়।

সেদিন আত্মসমর্পণের পর অধিনায়ক আজিজুল কামাল হাতে স্টেনগান নিয়ে উপস্থিত জনতার উদ্দেশ্যে বলেন, আপনারা শান্ত থাকুন, এখানকার সব কিছু আমাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, বালাগঞ্জের পুলিশ বাহিনী এবং রাজাকাররা আমাদের কাছে সালেন্ডার করেছে। আজ আমরা মুক্ত।

তারপর, সকাল ১০টার সময় থানা প্রাঙ্গণে কুয়াশাঘন সকালে মাঠের এক পার্শ্বে মুক্তিবাহিনীর সদস্যরা সারিবদ্ধভাবে অবস্থান গ্রহণ করেন। সবার হাতে অস্ত্র। অধিনায়ক আজিজুল কামাল দলের মুক্তিবাহিনীর ৪০জন মুক্তিযোদ্ধাকে উপস্থিত জনতার সামনে পরিচয় করিয়ে দেন। এসময় উৎসুক জনতা বিজয়ী মুক্তিযোদ্ধাদের অভিবাদন জানান। আর মাঠে জড়ো হওয়া সবাই চূড়ান্ত বিজয়ী হয়ে সৃষ্টি সুখের উল্লাসে ছড়িয়ে পড়েন বালাগঞ্জের গ্রাম থেকে গ্রামে।

 

শেয়ার করুন:

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

error: Content is protected !!