শুক্রবার, ২১ জানুয়ারী ২০২২ খ্রিস্টাব্দ | ৮ মাঘ ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

আব্দুর রশীদ লুলু

দিলওয়ার: অনুভবে অনুভূতি



কবি দিলওয়ার

১ জানুয়ারি এলে প্রায়ই কবি দিলওয়ার-এর কথা আমার মনে পড়ে। ইংরেজি নববর্ষের এই দিনে ১৯৩৭ সালে সিলেটে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। গণমানুষের কবি অভিধায় অভিষিক্ত এই কবিকে কাছে থেকে দূরে থেকে অনেকবার আমি দেখেছি। যতদূর মনে পড়ে, ১৯৮১ সালে যখন আমি দশম শ্রেণিতে পড়ি তখন আমি তাঁর সম্পর্কে প্রথম অবগত হই। মফস্বলের স্কুলে পড়াশোনার পাশাপাশি তখন আমি বাংলা সাহিত্যের প্রেমে আচ্ছন্ন হয়ে আছি, গল্প-কবিতায় খাতা ভরে ফেলছি। স্কুল লাইব্রেরির কথাসাহিত্যের বইগুলো অগ্রাধিকার পেলেও রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দ ও সুকান্তের কবিতাও গো-গ্রাসে গিলছি। এর মধ্যে ক্লাসে একদিন বাংলা সাহিত্য পড়াতে এসে ‘এটি স্যার’ (আর্টসের টিচার- জনাব মো. আব্দুর রউফ) জানালেন সিলেটের একজন কবি এবার একুশে পদক পেয়েছেন।

সেই থেকে কবি দিলওয়ার (১৯৩৭-২০১৩)-এর প্রতি আমার আগ্রহবোধ। তারপর সিলেট শহরের বুকসপগুলো ঘেঁটেঘেঁটে কিনি কবি দিলওয়ারের বই। চোখ রাখি পত্র-পত্রিকায়- দিলওয়ারের লেখা থাকলে কিনি সেগুলো। যখন-তখন আওড়াই- “পদ্মা মেঘনা সুরমা যমুনা/ অশেষ নদী ও ঢেউ/ রক্তে আমার অনাদি অস্থি বিদেশে জানে না কেউ।” এছাড়া রেডিওতে শুনি তাঁর লেখা গান- তুমি রহমতের নদীয়া দোয়া করো মোরে হযরত শাহজালাল আউলিয়া…………। উল্লেখ্য, তখন রেডিও-ও আমার অন্যতম প্রিয় বস্তু ছিল। সুযোগ পেলেই আমি রেডিও’র বিভিন্ন অনুষ্ঠান আগ্রহ সহকারে শুনতাম। রেডিও শোনা নিয়ে সেসময় আমি অনেক বকাও খেয়েছি, বিব্রতকর অবস্থায়ও পড়েছি। উল্লেখ্য, বিগত শতাব্দির সেই আশির দশকে রেডিও আমার জন্য সহজলভ্য ছিল না। এখন ভাবি, শিল্প-সাহিত্যের চর্চায় লেগে থাকা আমার জন্যে সেই রেডিও শোনা একেবারে বিফলে যায়নি।
যা হোক, সে সময় অর্থাৎ বিগত শতাব্দীর আশির দশকের শুরুতে আমি আমার অন্যতম প্রিয় কবি দিলওয়ারকে একটি চিঠি লিখি। তিনি আমার সে চিঠির উত্তরও দেন। ৫ মে ১৯৮২ সালে আমাকে লেখা সে চিঠি এখানে হুবহু তুলে ধরা হল-

প্রিয় রশীদ,
কল্যাণ এবং বিচক্ষণতা তোমার পাথেয় হোক। পত্রের জবাব দেরিতে যাচ্ছে, কারণ আমি বাড়ি ছিলাম না। দুঃসহ দৈহিক যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ হয়ে এক বোনের বাড়ী চলে গিয়েছিলাম। আঠারো দিন পরে ফিরেছি।
গ্রামের নিভূতে বসে তুমি যে জীবনকে আত্মস্থ করার চেষ্টা করছো, সেটা এক মহৎ প্রচেষ্ঠা। তবে হ্যাঁ, মানবতার জন্যে একটা উল্লেখযোগ্য কিছু করতে গেলে, গূঢ়তম জ্বালা-যন্ত্রণা হজম করার শক্তি সঞ্চয় করতে হবে।
ওকথা থাক, তুমি নিশ্চয়ই পড়াশোনায় আছো। আমি চাইব পায়ের তলের মাটি তোমার শক্ত হোক। তোমার নির্মল সাহিত্যানুভূতি তোমার সামাজিক প্রতিষ্ঠার অলংকার হয়ে দেখা দিক। আমি সুস্থ হয়ে উঠি। তোমাকে লিখব কবিতা পাঠানোর জন্য। মাসে সব মিলিয়ে ৬টার বেশী লিখো না। মা, বাবাকে সালাম জানিও। তোমাদের জন্যে আবারও প্রীতি।
ইতি
আশীর্বাদক-
দিলওয়ার

আমার ধারণা, ব্যক্তিগতভাবে আমাকে লিখা হলেও চিঠিটি তরুণ লেখকদের উদ্দীপ্ত করতে পারে এবং কবি দিলওয়ার গবেষকদের কাজে লাগতে পারে। সে বিবেচনায় থিন পেপারে কাঁপা কাঁপা হাতে লেখা সে চিঠিটা আমার ছেলে তরুণ লেখক আনিসুল আলম নাহিদ অন্যান্য দূর্লভ ডকুমেন্টের সাথে আনোয়ারা ফাউন্ডেশন আর্কাইভে যত্ন সহকারে তুলে রেখেছে।

এই সাথে মনে পড়ছে, সেই আশির দশকে তরুণ সাহিত্য পরিষদ, মাদার বাজার, বালাগঞ্জ (বর্তমানে ওসমানীনগর) সিলেট থেকে প্রকাশিত আমার সম্পাদিত অনিয়মিত সাহিত্যপত্র ‘প্রগতি’তে আমার অনুরোধে কবি দিলওয়ার লিখেন সনেট-‘মাদার বাজারে প্রেম’। চমৎকার সে কবিতাটি পরবর্তীতে আমার সম্পাদিত ‘আনোয়ারা’য় পুন:মুদ্রিত হয়েছে প্রধানত বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করার মানসে।
তারপর একাধিকবার আমি তাঁর ভার্থখলাস্থ খান মঞ্জিলে গিয়েছি। কাছে থেকে আলাপ করেছি। যিনি সাহিত্য বিষয়ে আমার পঠন-পাঠনের পরীক্ষা নিয়েছেন। আরবী সাহিত্যে আটকে গিয়েছি। পৃথিবীর সমৃদ্ধ সেই সাহিত্য সম্পর্কে তিনি রীতিমতো লেকচার দিয়েছেন। ফুলটাইম লেখক ও ভালো বক্তা প্রিয় কবির কথা শুনতে শুনতে আমার প্রায়ই মনে হতো- বিশ্ববিদ্যালয়ে সাহিত্যের শিক্ষক হলে তাঁকে ভালো মানাতো। আবার কখনো কখনো ভেবেছি আমার অন্যতম প্রিয় ব্যক্তিত্ব আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদের বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের মতো কবি দিলওয়ার একটি সাহিত্য কেন্দ্র গড়লে মন্দ হতো না।

খান মঞ্জিলে আসা-যাওয়ার সূত্রে তাঁর বড়ছেলে কবি কিশওয়ার ইবনে দিলওয়ারের সাথেও আমার আলাপ-পরিচয় হয়। সেকথা কিশওয়ারের মৃত্যুর পরপর আমি দৈনিক সিলেটের ডাকে স্মৃতিচারণ আলোকে লিখেছি। সেখানে প্রিয় কবি দিলওয়ারের প্রসঙ্গও এসেছে সংগত কারণে। কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের ‘আমার ছেলেবেলা’ প্রকাশের পরপর আমার মনে দানা বাধেঁ ‘কবি দিলওয়ারের ছেলেবেলা’ লেখার। ভেবেছিলাম কবির সাথে আলাপ করে করে একেক একেক অধ্যায় লিখার। তারপর তাঁকে দেখিয়ে পত্রিকায় দেব। তারপর বই করব। নানা কারণে সে ইচ্ছে আমার বাস্তবায়ন হয়নি। তারপর ভেবেছিলাম আমার সম্পাদিত শিকড় সন্ধানী প্রকাশনা ‘আনোয়ারা’র প্রথম লেখা প্রথম বই কলামে এতদসংক্রান্ত তাঁর লেখা প্রকাশ করব। যে কলামে পর্যায়ক্রমে সিলেটের বিশিষ্ট কবি-সাহিত্যিক-সাংবাদিক: যেমন- প্রফেসর মো. আব্দুল আজিজ, নন্দলাল শর্মা, আব্দুল হামিদ মানিক, জাহান আরা খাতুন, ঝর্ণাদাশ পুরকায়স্থ, বোরহান উদ্দিন খান, সাদিয়া চৌধুরী পরাগ, আমেনা আফতাব, শামসাদ হুসাম প্রমুখ লিখলেও একাধিকবার যোগাযোগ করেও তাঁর লেখা উদ্ধার করতে পারিনি। অবশ্য সে সময় তাঁর বয়সের ভার, দর্শনার্থীদের সময় দান সর্বোপরি কিশোয়ার ইবনে দিলওয়ারের অসুস্থতা প্রভৃতি অনেকগুলো সংগত কারণও বিদ্যমান ছিল।

আনোয়ারা ফাউন্ডেশন পরিচালিত আমাদের প্রিয় প্রতিষ্ঠান রাজীব স্মৃতি গ্রন্থাগারে আমরা বিশেষত: আমার ছেলে আগ্রহ সহকারে মরহুম কবি দিলওয়ারের অনেকগুলো বই সংগ্রহ করে রেখেছে। কিন্ত আমরা দুঃখের সাথে লক্ষ্য করছি, অনেক পাঠক কবি দিলওয়ার সম্পর্কে অজ্ঞ ও অনাগ্রহী। এটা আমাদের ব্যথিত করে। তবে আমাদের সান্ত্বনা রাজীব স্মৃতি গ্রন্থাগারে সংরক্ষিত কবি দিলওয়ারের বইগুলো একদিন হয়তো গবেষকদের কাজে লাগবে। হঠাৎ হয়তো কোনোদিন কোনো উৎসাহী পাঠক দিলওয়ারে মুগ্ধ হবে। প্রসঙ্গত: কবি দিলওয়ার পরিষদ ও দিলওয়ার অনুরাগীদের আমরা অনুরোধ করব, গণমানুষের কবি দিলওয়ারের কবিতা ও পরিচিতি ব্যাপকভাবে বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য।

কিছু কিছু গদ্য লিখলেও আমার মনে হয় কবি দিলওয়ার কবিতায় সার্থক ছিলেন। কবিতা সহজেই তাঁর হাতে প্রাণবন্ত হয়ে উঠতো। নিশ্চয় বাংলা-সাহিত্যে তাঁর কবিতার আবেদন সহজে ফুরাবে না। বিশ্বজনীন এই কবির কবিতা বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়ুক এবং শোষণমুক্ত সুস্থ-সুন্দর বিশ্ব গড়তে অবদান রাখুক এই আমাদের প্রত্যাশা।

লেখক, সম্পাদক – আনোয়ারা (শিকড় সন্ধানী প্রকাশনা)।

 

শেয়ার করুন:

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

error: Content is protected !!