রবিবার, ২২ মে ২০২২ খ্রিস্টাব্দ | ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

আব্দুর রশীদ লুলু

শাহ্ আব্দুল করিম: কালজয়ী এক বাউলের কথা ও স্মৃতি



শাহ্ আব্দুল করিম। ছবি: সংগ্রহ

ব্যক্তিগত ও বৈষয়িক বেশ কিছু সমস্যার মধ্যে ১২ সেপ্টেম্বর ২০০৯ বাস জার্নিতে ছিলাম। মনটা ভারভার, এমতাবস্থায় সকাল ১০টার দিকে ইউপি সচিব নৃপেন্দ্র কুমার দাশ সেলফোনে জানালেন বাউল শাহ্ আব্দুল করিম মারা গেছেন। খবরটা পেয়ে আমি উদাস দৃষ্টি বাসের জানালা দিয়ে বাইরে ছড়িয়ে দেই। ব্যক্তিগত বেদনাবোধ ছাপিয়ে শাহ্ আব্দুল করিমের মুখাবয়ব ও স্মৃতি চোখের সামনে দুলে ওঠে।

২০০৬ সালের মার্চ মাসের কথা। হঠাৎ একদিন যুক্তরাজ্য থেকে আমার এক সহপাঠী ফোনে একটি গানের দু’টি কলি আওড়িয়ে জানতে চান- গানটি কার লেখা? আমি চোখ বুঁজে বলে দিই- শাহ্ আব্দুল করিমের। তারপর তিনি আমাকে অনুরোধ করেন সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার উজানধল গ্রামে গিয়ে রোগ জর্জরিত শাহ্ আব্দুল করিমকে দেখে আসতে এবং তাঁর ব্যাংক একাউন্ট নাম্বার সংগ্রহ করে দিতে। আমি তখন পেশাগত দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি সংসার, লেখালেখি ও সম্পাদনা নিয়ে ভীষণ ব্যস্ত, তাই তার এহেন প্রস্তাবে আমি আমতা আমতা করি। কিন্তু তিনি নাছোড়বান্দা। তিনি তার বন্ধু-বান্ধবের সহযোগিতায় বাউল শাহ্ আব্দুল করিমকে সম্মান জানানোর পাশাপাশি আর্থিক সহযোগিতা করতে চান। অগত্যা সময় বের করতে হলো।

আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষক-লেখক জনাব মোঃ আব্দুর রউফসহ ছয় সদস্যের একটি দল গাড়ী নিয়ে ৮ এপ্রিল ২০০৬ বেরিয়ে পড়ি শাহ্ আব্দুল করিমের সন্ধানে। ভাঙ্গা-চোরা রাস্তায় দীর্ঘ সময়ে দিরাই উপজেলা সদর ও সেখান থেকে ইঞ্জিন বোটে কালনী নদীর বুক চিরে উজানধল পৌঁছি বাদ জোহর। আমাদের যাওয়ার সংবাদটা সেলফোনে জানিয়ে দেয়া ছিল বাউল শাহ্ আব্দুল করিমের একমাত্র ছেলে শাহ্ নূরজালাল (বাবুল)কে। নূরজালাল অভ্যর্থনা জানিয়ে আমাদের ভেতরে নিয়ে যান। বয়সের ভারে ন্যুব্জ বাউলের সাথে আমাদের কুশল বিনিময় হয়। যুক্তরাজ্য থেকে প্রেরিত আমার সেই সহপাঠীর অভিনন্দন পত্র আমি সযত্নে তাঁর হাতে তুলে দিই।

যা হোক শুনেছিলাম শাহ্ আব্দুল করিম নাস্তিক। টেপ রেকর্ডারসহ আমি মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে গিয়েছিলাম তাঁর একটা সাক্ষাৎকার গ্রহণের জন্য। উদ্দেশ্য আস্তিক-নাস্তিকতার বিষয়ে তাঁর চিন্তা-চেতনা যাচাই। অতি উৎসাহের সাথে “আনোয়ারা”-এর নিজস্ব প্রতিনিধি টেপ রেকর্ডার অন করে এবং আমি ধর্ম-দর্শন, আল্লাহ্, ইহকাল-পরকাল সম্পর্কে তাঁকে প্রশ্ন করতে থাকি। কিন্তু তিনি অসংলগ্ন উত্তর দেন। উপলব্ধি করি, সাক্ষাৎকার গ্রহণ তথা তাঁর চিন্তা-চেতনার পরিচয় পাওয়ার সময় শেষ হয়ে গেছে। অগত্যা আমি নিজেকে গুটিয়ে নিই। অবশ্য আমার উদ্দেশ্য বুঝতে পেরে নূরজালাল বার বার আমাকে বুঝানোর চেষ্টা করেন তার বাবা আস্তিক।

প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য, লেখক বন্ধুদের অনুরোধ সত্ত্বেও শাহ্ আব্দুল করিমের সে সাক্ষাৎকার আমি প্রকাশ করিনি। তবে ক্যাসেটটা এখনো আমার কাছে সযত্নে রক্ষিত আছে। বলা দরকার, ফিরে এসে আমি শাহ্ আব্দুল করিমের গানের বইগুলো ঘাটতে থাকি এবং তাঁর আস্তিকতার সন্ধান লাভ করি। লিখি ‘শাহ্ আব্দুল করিমের চিন্তা-চেতনায় আল্লাহ্ ও আধ্যাত্মিকতা।’ লেখাটি দৈনিক সিলেটের ডাক, মাসিক আজকের বিশ্ববাংলাসহ দেশ-বিদেশের বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় গুরুত্ব সহকারে প্রকাশিত হয়। শাহ্ নূরজালাল লেখাটা পড়ে ফোনে আমার কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

যা হোক, ওই দিন (০৮ এপ্রিল ২০০৬) শাহ্ আব্দুল করিমকে দেখে তাঁর ব্যাংক একাউন্ট নম্বর সংগ্রহ করে ফিরে আসতে চাইলে তিনি আমাদের না খেয়ে আসতে দেননি। আমার খাওয়ার রুচি ছিল না। আমি না খেলেও আমার সফর সঙ্গীরা তাঁর অনুরোধ রক্ষা করেন। আমি এই ফাঁকে তাঁর বাড়ী, স্ত্রীর কবর ও গানের ঘর ঘুরে দেখি। অতিথি পরায়ন শাহ্ আব্দুল করিম আমার সাথে থেকে বার বার আক্ষেপ করেন- আপনি খেলেন না, খেলেন না। আমাদের বার বার বারণ সত্ত্বেও তিনি নৌকাঘাট পর্যন্ত আমাদের এগিয়ে দেন।

তারপর সেই যুক্তরাজ্য প্রবাসী ও অন্যান্যদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ২৬ আগস্ট ২০০৬ সিলেট সিটি কর্পোরেশন মিলনায়তনে বাউল শাহ্ আব্দুল করিমকে তিন লক্ষ টাকা প্রদাণ করা হয়। এ উপলক্ষে আমার সম্পদনায় প্রকাশিত হয় পাঁচ ফর্মার “আল-বির” (শাহ্ আব্দুল করিম সংখ্যা)। এতে শাহ্ আব্দুল করিমকে নিয়ে লিখেন বিশিষ্ট লেখক-গবেষক প্রফেসর শ্রী নন্দলাল শর্মা, বিশিষ্ট লেখক-গবেষক আব্দুল হামিদ মানিকসহ সিলেটের বিশিষ্ট জনেরা। যা হোক, আমরা ২৬ আগষ্ট ২০০৬ এক অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানের মাধ্যমে প্রধান অতিথি সিলেট সিটি মেয়র বদরউদ্দিন আহমদ কামরানের হাত দিয়ে তাঁর হাতে তুলে দিই তিন লক্ষ টাকার ড্রাফট।

উল্লেখ্য, উক্ত অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট লেখক-গবেষক-শিক্ষাবিদ প্রফেসর শ্রী নন্দলাল শর্মা, বিশিষ্ট লেখক-গবেষক-শিক্ষাবিদ এবং সুবক্তা ড. আবুল ফতেহ ফাত্তাহ প্রমুখ। বক্তারা এই উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করেন। তাঁদের কথা-বার্তা শুনে আমার ভালো লাগে। এই উদ্যোগের সাথে সংশ্লিষ্ট থেকে পরিশ্রম ও ছুটাছুটিকে সার্থক ভাবি।

যা হোক, ওই অনুষ্ঠানে তিন লক্ষ টাকার ড্রাফট বাউল শাহ্ আব্দুল করিমের হাতে তুলে দিয়ে তাঁর প্রতিক্রিয়া জানতে চাওয়া হয়। শাহ্ আব্দুল করিম বলেন, আমাকে তিন হাজার টাকা ……………। পাশে থেকে অন্যরা শুধরিয়ে দেন- তিন হাজার নয়, তিন লক্ষ। আমার তখন মনে হয়েছে বোধশক্তি থাকতে তাঁকে এই সম্মান ও টাকাটা দেয়া দরকার ছিল। তিনি সত্যিকার অর্থে উপলব্ধি করতে পারতেন, তাঁর সাধনা ও প্রতিভার যথার্থ মূল্যায়ন হয়েছে। প্রসঙ্গতঃ বলা দরকার, আমাদের এই অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানে মেয়র কামরান শাহ্ আব্দুল করিমের গান- ‘ঝিলমিল ঝিলমিল করে রে ময়ুর পঙ্খী নায়’ গেয়ে অনুষ্ঠানকে প্রাণবন্ত করেন।

শাহ্ আব্দুল করিমকে নিয়ে অনেক লেখালেখি হয়েছে। বিদগ্ধজন তাঁকে ‘বাউল সম্রাট’, ‘মরমী কবি’, ‘গণ মানুষের কবি’ প্রভৃতি অভিধায় অভিষিক্ত করেছেন। জীবদ্দশায় তিনি অনেক সম্মান, ভালোবাসা ও স্বীকৃতি পেয়েছেন। তাঁর মৃত্যুতে প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীসহ বিশিষ্ট জনেরা শোক প্রকাশ করেছেন। রেডিও এবং টিভি চ্যানেল সমুহে তাঁকে গুরুত্ব সহকারে উপস্থাপন করা হয়েছে। শাহ্ আব্দুল করিম জীবদ্দশায় দুই শতাধিক প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন থেকে স্বীকৃতি ও সম্মান পেয়েছেন।

আমার যতদুর মনে পড়ে, শাহ্ আব্দুল করিমকে নিয়ে প্রথম লেখেন তাঁর ভাগ্নে তোয়াহেদ। ‘বাউল শাহ্ আব্দুল করিম’ নামের ৩৬ লাইনের কবিতায় তোয়াহেদ তার মামা শাহ্ আব্দুল করিমের বিস্তারিত বর্ণনা দেন এভাবে- “বাউল সাধক আমার মামা/শাহ্ আব্দুল করিম নাম/জন্ম দিরাই উপজেলায়/উজান ধল গ্রাম/গরীব কূলে জন্ম তাঁর/দারিদ্র্যের অভিশাপে/পড়ালেখা শেখাতে/পারেননি তাঁর মা-বাপে/নিজের চেষ্টায় কিছু পড়ে/ছাড়লেন নিজ পাড়া/কন্ঠে গরীবের গান/হাতে নিয়ে এক তারা/রচিতে দেখি মানুষের সুখ-দুঃখের ছবি/কেউ না বললেও/আমি বলি গণ কবি …….।”

তোয়াহেদের সেই কবিতাটি আমি যত্ন সহকারে আমার সম্পাদিত “রক্ত জবা” (সাহিত্য-সংস্কৃতি বিষয়ক অনিয়মিত প্রকাশনা) ২য় সংখ্যায় ২৬ মার্চ ১৯৮৯-এ প্রকাশ করি। খুব সম্ভব তোয়াহেদের উক্ত কবিতাটি ঐ সময়ে কবি সিরাজ চৌধুরী সম্পাদিত সাহিত্য-সাপ্তাহিকী ‘সুর’-এও প্রকাশিত হয়েছিল। উল্লেখ্য, শাহ্ আব্দুল করিমকে নিয়ে তোয়াহেদের সেই কবিতাটির গুরুত্ব বিবেচনা করে আমি আবার কবিতাটি আমার সম্পাদিত “আনোয়ারা” (শিকড় সন্ধানী প্রকাশনা)’র সংখ্যা-১৬ এ ১৫ সেপ্টেম্বর ২০০৭ পূনঃমুদ্রিত করি।

তোয়াহেদের লেখা দিয়ে শুরু হয় বাউল শাহ্ আব্দুল করিমকে নিয়ে লেখালেখি। ক্রমে বিভিন্ন গুণী ব্যক্তিত্বের কলমে তিনি ওঠে আসেন এবং এক সময় লাইম লাইটে চলে আসেন। দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে পড়ে সুনামগঞ্জের ভাটি অঞ্চলের এক সাধকের নাম। আঞ্চলিক ছাড়াও জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অনেক পুরস্কার/সম্মাননা জোটে তাঁর ভাগ্যে। অনেক বিদগ্ধজন তাঁর সাহায্যে এগিয়ে আসেন। তিনি নাম-সুনামের পাশাপাশি পরিণত বয়সে অনেক অর্থও লাভ করেন।

শাহ্ আব্দুল করিম বিচিত্র বিষয়ে গান করেছেন। তাঁর শ্রম-সাধনা যথার্থ হয়েছে। তাঁর কালজয়ী গান নিঃসন্দেহে অনেক দিন তাঁকে অমর করে রাখবে। ছোটবেলায় আমাদের এলাকায় বর্ষাকালে নৌকা বাইচ হতো। তখন বাইচদের কন্ঠে করতালের সাথে গান শুনতাম- “কোন মিস্তরী নাও বানাইল কেমন দেখা যায়/ঝিলমিল ঝিলমিল করে রে মূয়র পঙ্খী নায়।” তখন অবশ্য জানতাম না, এই চমৎকার ও জনপ্রিয় গানের স্রষ্টা শাহ্ আব্দুল করিম। এখন চল্লিশ পেরিয়ে ভাবি, শাহ্ আব্দুল করিম সত্যিকারের একজন শিল্পী। অনেক দিন তিনি মানুষকে গানে মাতিয়ে রেখেছেন এবং নিশ্চয় আরো অনেক কাল মাতিয়ে রাখবেন।
শাহ্ আব্দুল করিম তাঁর নিজের সম্পর্কে অনেক কথা বলে গেছেন গানে গানে। যেমন- তাঁর জন্ম, বেড়ে ওঠা, মা-বাবা ও পরিবেশ-পরিস্থিতির কথা। তাঁর গানের কথা অনুযায়ী তাঁর জন্ম ১৩২২ বাংলার ফাল্গুন মাস (ফেব্রুয়ারি ১৯১৬ সাল)-এ সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার উজানধল গ্রামে। মা-বাবা ছিলেন দরিদ্র। তাই লেখাপড়া করা হয়নি। তাঁর স্ত্রী সরলা। তিনি তাকে ভীষণ ভালোবাসতেন। অকালে স্ত্রীর মৃত্যুতে তিনি ভীষণ কষ্ট পেলেও স্ত্রীর প্রতি তাঁর ভালোবাসাকে উজাড় করে দিয়েছেন গানে। তাঁর উল্লেখযোগ্য বইগুলো হলো- ভাটির চিঠি, কালনীর ঢেউ, কালনীর কূলে, আফতাব সঙ্গীত, গণ সঙ্গীত ও ধল মেলা।

শাহ্ আব্দুল করিম পরিণত বয়সে সিলেট শহরের একটি ক্লিনিকে ১২ সেপ্টেম্বর ২০০৯ (রমজান ১৪৩০) সকাল ৮.০০টার দিকে ইন্তেকাল করেন। বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষের ভালোবাসা নিয়ে তিনি নিজ বাড়ীতে প্রিয়তমা সরলার পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত হয়েছেন। আমরা তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে তাঁর বইগুলো তথা সব লেখা রাজীব স্মৃতি গ্রন্থাগারে সংরক্ষণের চেষ্টা করছি। পরিশেষে, আমি তাঁর রূহের মাগফেরাত কামনা করি।

লেখক: গল্পকার, প্রাবন্ধিক ও কৃষি উন্নয়ন কর্মী।

শেয়ার করুন:

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

error: Content is protected !!