রবিবার, ২২ মে ২০২২ খ্রিস্টাব্দ | ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

দানির সেহরি



দিন দশটা বাজে। পনেরো বছরের দানি এখনো ঘুমিয়ে আছে। সকাল নয়টার আগে তার ঘুম থেকে জাগার কথা। দানির মা জুমানা। পঁয়ত্রিশোর্ধ ভদ্রা একজন গৃহকর্ত্রী। তিনি দানিকে জাগিয়ে দিতে ওর বেড-রুমের দরোজায় নক করলেন। দানির ঘুম ভাঙছে না। পাঁচ মিনিট পর পর করে বেশ কয়েকবারই তিনি নক করলেন। যদিও তার তিনবার নক করার অভ্যাস। তিন বারের বেশি কাউকে ডাকতে তিনি পছন্দ করেন না। কিন্তু ছেলে দানির জন্য সে সীমানায় থাকা যায় না। ও তো ঘুমের ঘোড়া। জুমানা দানিকে ঘুমের গাধাও বলেন না কারণ সত্যি সত্যি যদি ওর মাঝে গাধার অভ্যাস চলে আসে। যদিও জুমানার জানা নেই গাধার অভ্যাস আসলে কি।

দানির দরোজায় লক নেই। দানি মা’কে আগেই মানা করে রেখেছে, মা যেন দরোজা ঠেলে তাকে ডাক পাড়তে ভিতরে না যান। পনেরো বছরের দানির কথায় জুমানা যুক্তি খুঁজে পেলেন। সেহেতু তিনি প্রায় ছয় মাস হয় দানির কথার অনুসরণ করে চলেছেন। তবে আজ তিনি সে সংকল্পের ব্যতিক্রম করলেন। কারণ, আজ কেন জানি দানি উঠতে দেরি করছে। ছেলেটার অসুখ-বিসুখ হল কি না, কে জানে।

জুমানা দানির দরোজাটা আস্তে আস্তে ঠেলে ভিতরে ঢুকলেন। ভাগ্যিস, দানির পরনে আজ আন্ডারওয়্যার ছিল। আজ সে একদম উদোম নয়। যদিও গড়াগড়িতে তার উপর থেকে কুইলটটি সরে গেছে।
ঘুমের ঘোরেই সে যখন দেখতে পেল মা ভিতরে চলে এসেছেন। দানি চট জলদি কুইলটটি টেনে নিয়ে বল্লো,মাাাাাাম! আমি না মানা করলাম এভাবে ভিতরে ঢুকতে।

মা বল্লেন, উইকেন্ড বলে কি তুমি এত লম্বা ঘুমুবে? সে কবে থেকে ডাকাডাকি করছি, তুমি উঠছো না কেন?
দানি বল্লো, মাা, তোমাদের চালাকি আর চলবে না।
মা হতভম্ব। বল্লেন, কি চালাকি দানি।
দানি জবাব দিল, আমি আজ সাওম পালন করছি মাা।
মা বল্লেন, না খেয়ে তোমার আবার রোযা কি? সেহরি ছাড়া কি রোযা হয়?
দানি বল্লো, এ জন্যই তো বল্লাম, তোমাদের চালাকি। আমি এখন জেনে গেছি। না খেয়েও রোযা হয় মাম, একশো বার হয়। সেহরিটা একটি সুন্নাহ মা। ফারদ্ব নয়। জরুরি নয়। প্রয়োজন হলে সেহরি না খেয়েও সাওম পালন করতে হয়।
মা বল্লেন, ঠিক আছে বাট তুমি তো সাওমের নিইয়াত করোনি। মা তাচ্ছিল্য স্বরে এমন ভান করে বল্লেন যেন ওর রোযা ভাঙ্গানোর এক ছুতো তিনি পেয়ে গেছেন।
দানি বল্লো,মা আমি নিইয়াতও করে ফেলেছি।
মা বল্লেন, নিইয়াত রাতে করতে হয়, তুমি সেহরির সময় জাগোনি তো নিইয়াত কোন সময় করেছো?
দানি বল্লো, মা! আজ রামাদ্বান শুরু হয়েছে। রামাদ্বানের ফারদ্ব সিয়াম, নাওয়াফিল এবং নির্দিষ্ট কিছু সিয়ামের নিইয়াত—মধ্য দিনের আগে করলেও হয়।তাছাড়া আমার তো কাল রাত থেকেই ইচ্ছা ছিল আজ সাওম পালন করবো। আমি জানি, তোমরা আমাকে সাহুরের সময় ডেকে উঠাবে না। তোমরা চাইবে না, এ পরীক্ষার সময় আমি সাওম ধরি। আর এ জন্য আমিও তোমাদেরকে অনুরোধ না করে চেষ্টা করেছি জেগে থাকতে। যেন সাহুরের বেলা তোমাদেরকে সারপ্রাইজ দিতে পারি। কিন্তু শেষমেষ সম্ভব হয়নি। কাতর হয়ে এক সময় ঘুমিয়ে পড়ি। এলার্মও আমার বেলায় কাজ হয়নি—মা।
ভোরে যখন বেঘোরে পেশাব করতে বাথরুমে যাই, হঠাৎ মনে পড়লো—আমার তো সুহুর খাওয়া হয়নি। তখন কি করবো, দ্বিধায় পড়ে গেলাম। তারপর ভাবলাম, আমি তো এখন ছোট ভাই জামি আর ছোট বোন সানার মত ছোট নই। আমি এখন কিশোর। আমাকে যদ্দুর সম্ভব সিয়াম পালন করতেই হবে। তাই সংকল্প করেছি মা আজ আমি সাওম ধরবোই।
মাম! লিসেন, আমি কাপুরুষ বান্দা হতে চাই না। ঐ দেখ আমার হাতের মাসল। আমার শক্তি আছে মাম। সাওম পালনে কোন অসুবিধা হবে না।

মা বল্লেন, ঠিক আছে বাবা, কাল থেকে অন্তত খেয়েই রাখবে। সেজন্য তোমাকে সেহরির সময় ডেকে উঠাবো।
দানি খুশি হয়ে বল্লো, থ্যাংকস মা। তবে মনে রেখো মা, দরোজায় নক করতে যেন ভুলে না যাও। আমি না জাগলে আমার মোবাইলে কল করে নিও। তাতে তোমার কষ্ট কম হবে—মাম।

জুমানা রুম থেকে যেতে যেতে দানিকে জিজ্ঞেস করলেন, আচ্ছা, তুমি এত সব নীতি-কথা কোত্থেকে শিখলি?

দানি বল্লো, আমি নেটের উপর ভরসা করি না। ওখানে অনেক সন্দেহ জাগে। আমি আমার শায়েখের রামাদ্বান ওয়ার্কশপ থেকে সরাসরি শিখে নিয়েছি, মা।
জুমানা স্বস্তি অনুভব করলেন। এবং তিনি ঠোঁটের কোণে হাসির আভা ফুটিয়ে দানির রুম থেকে দ্রুত বেরিয়ে পড়লেন।

শেয়ার করুন:

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

error: Content is protected !!