বুধবার, ১৯ জুন ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ | ৫ আষাঢ় ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

NYC, The City That Never Sleeps, সেখানে হাইয়া আলাল ফালাহ।। হাবীব নূহ



১.
The Big Apple ডাকনামে খ্যাত মহানগরী নিউ ইয়র্ক। সম্প্রতি,এই শহরের ইসলামিক সেন্টার, নামায-ঘর এবং মাসজিদগুলোকে, জুমুআ ও রামাদ্বানের মাগরিবের আযানের ধ্বনি, সংযত-পরিমাণে বাইরে পাঠানোর অনুমতি প্রদান করা হয়েছে।

যদিও এ ঘোষণার পূর্ব থেকে United States এর কিছু মাসজিদ অনুমোদন সাপেক্ষে এ সুবিধা ভোগ করছিল। তবে নিউ ইয়র্ক সিটিতে এই প্রথম।

আমেরিকার নিউ ইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের একটি শহর হল নিউ ইয়র্ক। শহরটি US এর সবচেয়ে জনবহুল নগরী।
এই বৈশ্বিক শহরের আরেকটি nickname বা ডাকনাম হল “The Melting Pot”।
১৯০০ শতকের শুরুর দিকে নিউ ইয়র্কের ভাগ্যে এই ডাকনামটি তখন জুটে যখন অভিবাসনের কেন্দ্র হিসেবে শহরটি পরিচিতি লাভ করে।
ফলে, আজ বহু জাতি,বহু ধর্ম, বহু বর্ণ আর বিভিন্ন গোত্রের অভিবাসী সম্প্রদায়ের পাশাপাশি বসবাস সেখানে।
মুসলিমগণও মিশে আছে সেই সমাজে।আযান তাঁদের এক ঐতিহ্য ও অধিকার।ধীরে ধীরে সেই প্রাপ্য তাঁরা পেতে শুরু করেছেন।

২.
আয়তনে নিউ ইয়র্ক, লন্ডন শহর থেকে প্রায় অর্ধেক হলেও শহরটিতে জন-ঘনত্ব বেশি।
মূল শহরটি ৩০২.৬ বর্গমাইল (783.8 square kilometers)।
শহরটিতে প্রায় ৮৮ লক্ষ লোকের বাস।যদিও শহরে এক কোটি মানুষের বাস নেই তবুও হয়ত জনসংখ্যার ঘনত্বের বিবেচনায় ১৯৩০ দশক থেকেই শহরটি অতিমহানগরী বা Megacity সাব্যস্ত হয়ে আসছে।পৃথিবীর ৩৪টি মেগাশহরের একটি হচ্ছে নিউ ইয়র্ক সিটি অথবা সিটি অফ নিউ ইয়র্ক।
শহরের প্রায় ৩৬% অধিবাসীই US-এ জন্মগ্রহণ করেননি। এবং এই শহরের মানুষ ৮০০ -এর বেশি ভাষায় কথা বলে।

নিউ ইয়র্ক সিটিতে খ্রিস্টান এবং ইহুদি ধর্মের পরে ইসলাম হল তৃতীয় বিকশিত ধর্ম। এই শহরের অধিবাসীর প্রায় নয় ভাগই মুসলিম।পুরো আমেরিকার প্রায় বাইশ ভাগের উপরে মুসলিম এই শহরে বাস করেন।যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বেশি মুসলিম অধ্যুষিত শহর এটি।প্রায় আট লক্ষ মুসলিম এই বিশ্ব নগরীতে রয়েছেন। (অবশ্য—1.5 million Muslims আছেন the greater New York metropolitan area-এর মধ্যে।

এমনি এক গুরুত্বপূর্ণ শহরে ‘হাইয়া আলাছ ছালাহ’ (নামাযে চলে আস) এর ডাক এতদিনের গৃহবন্দী থেকে এখন মুক্ত হল। এই আযান এখন নিউ ইয়র্ক সমাজে প্রভাব দেখাবে এবং নামাযীদেরকে উৎসাহ যোগাবে।
আর এজন্যই এটি “নিউ ইয়র্কার” মুসলিমগণের জন্য সুখকর অর্জন এবং বিশ্বের সব সচেতন মুসলিমদের জন্যও একটি আনন্দদায়ক বার্তা।

৩.
এ ঘোষণার গুরুত্ব তুলে ধরে NYC ওয়েবসাইটে লিখা হয়েছে :
Mayor Adams, NYPD Commissioner Caban Take Historic Step to Embrace Adhan, Muslim Call to Prayer Citywide.

সত্যিই এটি একটি Historic Step বা ঐতিহাসিক পদক্ষেপ।

এক্ষেত্রে নিউ ইয়র্কের মেয়র মি. এরিক অ্যাডামস (Eric Adams ) এবং তাঁর পরিষদ এবং NYPD কমিশনার Edward A. Caban সহ অন্যান্যদের অবদানের জন্য মুসলিমগণ নিশ্চয় কৃতজ্ঞ থাকবে।
বিশেষ করে মেয়র Eric Adams এর উদারতা ও মহানুভবতা স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
২৯ আগস্ট (২০২৩),New York City Hall -এ আযানের ঐ ঘোষণার অনুষ্ঠানে মেয়রের বক্তব্য ছিল মুগ্ধ করা।

অসংখ্য মুসলিম নারী-পুরুষ বেষ্টিত অনুষ্ঠানে, এক পর্যায়ে মেয়র বলেন :
“We want our brothers and sisters of Muslim faith to know that they are free to live their faith in New York City because, under the law, we will all be treated equally. Our administration is proud to finally get this done.”

৪.
হাডসন নদী ও ইস্ট প্রণালী বা ইস্ট নদীর মোহনা আর আটলান্টিক মহাসাগরের উপকূলে অবস্থিত নিউ ইয়র্ক শহরটি ইতিহাস আর ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ।

প্রায় পাঁচশত বছর (১৫২৪ সাল) আগে ইতালীয় ইউরোপীয় দ্বারা বর্তমানের নিউ ইয়র্ক শহরটি আবিষ্কৃত হওয়ার পর শহরটির নাম রাখা হয় “নুভেল অঁগুলেম” তথা নতুন অঁগুলেম(New Angoulême)।
এর প্রায় ৯০ বছর পর ওলন্দাজ (ডাচ) সময়ে (১৬১৪) শহরের নাম রাখা হয় “নতুন আমস্টারডাম”((New Amsterdam)।
অতঃপর, এর পাঁচ দশক পর (১৬৬৪ সাল),ব্রিটিশরা শহরটি দখলে নিলে এর নতুন নাম দেওয়া হয় নিউ ইয়র্ক।
মাঝে কিছু দিনের জন্য ডাচদের হাতে আবার যখন শহর চলে যায় তখন (July 1673) তারা শহরটির নাম ‘New Orange’ দিয়েছিল।
পুনরায় পুনরুদ্ধার হলে (November 1674), তখন আবার শহরটি New York নাম ফিরে পায়।

বহু ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক এই ঐতিহাসিক বন্দর শহর অদ্যাবধি বহু ঐতিহ্যকে প্রশ্রয় এবং লালন-পালন করে চলেছে।
সে ধারায় নতুন সংযোজন হল মুক্ত আযান।
সীমিত দিন আর ক্ষীণ স্বরে হলেও অবারিত আযানের শব্দ শহরের বাতাসে প্রবাহিত হবে। এবং এই নাদ অগোচরে ও নিভৃত হলেও city ​​dweller বা শহরবাসীকে জানান দিতে থাকবে যে, স্রষ্টা থেকে মহান কোথাও আর কেউ নেই—‘আল্লাহু আকবার’ আল্লাহই মহান।

৫.
মুসলিমদের আনাগোনা অথবা অবস্থান নিউ ইয়র্ক শহরে বহু পুরানা হলেও মাসজিদের সূচনা কিন্তু ১৯৩১ সালের পর (The Powers Street Mosque in Brooklyn)। তখন থেকে এ যাবৎ নিউ ইয়র্ক এলাকায় প্রায় তিনশত মসজিদ স্থাপিত হয়েছে।(হয়ত এর চেয়ে কম অথবা বেশি—সঠিক সংখ্যা এখনো নির্ণয় হয়নি)।

এবার এসব পবিত্র জাগা থেকে আযানে নিহিত সংক্ষিপ্ত অথচ পরিপূর্ণ সত্যের বাণী দিয়ে সত্যের দিকে নিউ ইয়র্কের মানুষকে ডাকা হবে।যদিও নিছক কম লোকই হয়ত তা উপলব্ধি করতে পারবে।

আযানের অন্তর্গত ছয়টি ‘আল্লাহু আকবার’ (আল্লাহ সবচেয়ে বড়) সমুচ্চ উচ্চারিত হয়ে নিউ ইয়র্কবাসীকে বলে দিবে যে, ডানে, বামে, সামনে, পিছনে এবং উপরে ও নিচে, কোন দিকেই কোন শক্তি, কোন ক্ষমতা আল্লাহর চেয়ে শক্তিশালী ও ক্ষমতাধর নেই।সেহেতু, মানুষের উচিত, প্রকৃত সাফল্যের জন্য আল্লাহর দিকেই ধাবিত হওয়া।

Finally;

নিউ ইয়র্কের মানুষের ভাগ্য এবার আরো সুপ্রসন্ন হয়েছে, তাঁরা এখন শুনতে পাবে—-
‘হাইয়া আলাল ফালাহ’
(সাফল্যের জন্য এসো)

‘হাইয়া আলাল ফালাহ’।

লেখক: মুফতি

শেয়ার করুন:

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন