শনিবার, ১৫ জুন ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ | ১ আষাঢ় ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

কাফফারায় কুপোকাত রিহান।। হাবীব নূহ



ইংল্যান্ডের আবহাওয়া তখন বেশ আরামদায়ক ছিল।স্প্রিং কাল চলছে।এ আবহাওয়ায় রামাদ্বানের সিয়াম পালনও খুব অনুকূল মনে হচ্ছিল ইংল্যান্ডের মুসলিমদের কাছে।মুসলিম ফ্যামেলিগুলোতে রামাদ্বানের আমেজ তখন চলছে।

১৭ বছরের রিহান কিছুকালের জন্য খালার বাড়িতে অবস্থান করছে।তার প্যারেন্টস জরুরি কাজে তাঁদের আপন দেশে চলে গেছেন।রিহানের পড়াশোনার চাপ বেশি তাই তার যাওয়া আর হয়নি।সে রয়ে গেছে খালার বাড়িতে।সেখানেই সে রোযা পালন করছে।

নাদুস নুদুস এবং শান্ত স্বভাবের রিহান।তার আবার মানুষজনের কাছে প্রিয় হতে সময় বেশি লাগে না।পরিচিতদের কাছেও সে প্রিয়পাত্র হয়ে উঠে অতি সহজে।সেজন্যই খালাত ভাই মুশতাকিরের সব বন্ধুরা এখন রিহানেরও বন্ধু।

বন্ধু হলে তো বন্ধুদের সাথে মাঝে মধ্যে এখানে-সেখানে ঘুরতে যেতে হয়।তা না করলে যেন ভাল ও কুল বন্ধু হওয়া যায় না।

রোযায় একদিন রিহানদের সব বন্ধু একত্রে কোথাও ঘুরতে বেরুলেন।তাদের গন্তব্য স্থানটি তাদের বাড়ি থেকে তেমন দূরে নয়।তাই তারা মুসাফির বিবেচ্য নন।

রিহান রাতে সেহরি খেয়ে সকালে সাওম ধরেই ছুটলেন বন্ধুদের সাথে।
ঘুরতে যেয়ে বেশ মজা করেই সময় কাটছিল তাদের।ঘুরাঘুরির এক পর্যায়ে রিহান স্বেচ্ছায় সাওম ভেঙ্গে ফেলে।লোভনীয় খাদ্য সামনে চলে আসায় রিহানের শান্ত জিভ অশান্ত হয়ে পড়েছিল।সাথে অমুসলিম বন্ধুদের কিছুটা পীড়াপীড়িও ছিল।সেহেতু ঐদিন রিহানের রোযা আর টিকল না।

সারাদিনের হৈহুল্লোড়ের পর রিহানরা বিকেলে ঘরে ফিরলেন।বাড়িতে এসে রিহানরা সন্ধ্যায় সবার সাথে মিলেমিশে ইফতারও সারলেন।

রাতে রিহান বিছানায় একটু আগেই চলে যায় সেই রাত।সারাদিনের ক্লান্ত যে সে।কিন্তু ঘুম ধরছিল না তার।শুয়ে শুয়ে কি যেন চিন্তা করছিল।এক সময় দিনের আনন্দ রিহানের কাছে ফিকে হতে লাগলো।আচমকা রিহানের হৃদয়, দুপুর রাতের শান্ত সময়ে অশান্ত হয়ে উঠলো।রামাদ্বানের পারিপার্শ্বিক পূণ্যময় উষ্ণতায় যেন তার দিল বিগলিত হতে শুরু করলো।অনুশোচনায় একসময় কাঁদতে শুরু করে দেয় রিহান।

রিহানের অঝোর অশ্রু ফেলা দেখে,পাশের বেডে থাকা খালাত ভাই মুশতাকিরের করুণা হল।
মুশতাকিরের জিজ্ঞাসায় রিহান মুশতাকিরের কাছে খুলে বলল তার কাঁন্নার কারণ।আজকের রোযা ভঙ করা কিছুতেই যেন উচিত হয়নি তার।আর এজন্য সে কাঁদছে।

মুশতাকির বয়সে কিছু ছোট হলেও সান্ত্বনা দিতে লাগলো রিহানকে।একসময় সে বলল, চলো ভাইয়া, কাল আমরা কোন এক মাসজিদের ইমামের কাছে যাই।সেখানে যেয়ে কনফেস করে ফেলবো।আশাকরি সব ঠিক হয়ে যাবে।
আইডিয়াটি রিহানের কাছে ভাল লাগলো।

পরদিন ওরা ছুটলো একজন ইমামের সন্ধানে।যার সান্নিধ্য পেলে তারা হয়ত একটা কিছু সমাধান পাবে।
বেশি দূর যেতে হয়নি তাদের।দুই মাইল দূরের এক মাসজিদে গিয়ে হাজির হলো তারা।মুশতাকিরের পরিচিত মাসজিদ।সেখানে তারা প্রধান ইমামকেও পেয়ে গেল। ইমাম মহোদয়কে খুলে বলল তাদের রোযা বিনষ্টের কাহিনী।

বিজ্ঞ ইমাম, মন দিয়ে সব শুনলেন।অতঃপর তিনি বললেন : তোমারা কি করেছো,সেটি খুব বড় কথা নয়।ভুল মানুষের হতেই পারে।আর তাছাড়া তোমরা এখনো যুবক।এ প্রতিকূল আর ভিন্ন পরিবেশে এরকম হওয়াই স্বাভাবিক।খুশির কথা হল, তোমরা,তোমাদের ভুল বুঝতে পেরেছো এবং ভুল সংশোধনের পথ খুঁজতে এখানে চলে এসেছো।এটাই তোমাদের সৌভাগ্য।
তারপর তিনি সমাধান দিয়ে বললেন :
মুশতাকির! তোমার তো রোযা রাখার বয়স।আর তুমি যেহেতু ঐ দিন শুরু থেকেই সাওম ধরোনি তাই তোমাকে ঐ রোযা না রাখার বদলে শুধু একটি সাওম ক্বাদ্বা স্বরূপ রাখতে হবে।রামাদ্বানের পর যে কোন এক সময় ঐ রোযা তুমি পুরা করবে, যাকে ক্বাদ্বা বলে।

আর রিহান! তোমাকে সেই একটি ক্বাদ্বা রোযার সাথে আরো ৬০ টি সিয়ামের কাফফারাহ করতে হবে।তুমি যেহেতু রোযার নিয়ত করে রোযা ধরেছিলে অতঃপর মাঝপথে খামোকা রোযা ভেঙ্গে ফেলেছো, তার মানে হল,প্রয়োজনীয় কোন কারণ ছাড়া নিজের খুশিতে তুমি রোযা নষ্ট করেছো তাই তোমাকে অতিরিক্ত ৬০ রোযা রাখতে হবে।যাকে কাফফারা বলে।এবং তা সাওমের সাথে মস্করা বা অবজ্ঞা করার শাস্তি।

এবং কাফফারা এ ভাবে তোমাকে পালন করতে হবে, ৬০টি সাওম একের পর এক,একনাগাড়ে রাখতে হবে।এই ৬০ দিন সময়ের মধ্যকার কোন ছেদ থাকতে পারবে না।
অবশ্য,যে কোন এক চন্দ্র মাসের প্রথম তারিখে যদি রোযা রাখা শুরু করো তবে ৬০দিন না হলেও পুরো দুই মাস সিয়াম পালন করলেই হয়ে যাবে।
এবং এই ৬০টি রোযার সাথে ক্বাদ্বার একটি সাওম অন্য যে কোন সময়ে,ভিন্ন ভাবে তুমি আদায় করতে পারবে।তো মোট ৬১টি রোযা তোমার জন্য কর্তব্য।

তবে একান্ত শারীরিক বা অন্য কোন শারিআহ সম্মত কারণে কাফফারার এই ৬০ টি সিয়ামে কেউ যদি অপারগ হয় তখন তার জন্য আরো চারটি অপশন খোলা আছে।তবে যেহেতু তুমি সুস্থ ও সবল,তাই তোমার জন্য আপাতত তা প্রযোজ্য নয়।

তিনি আরো বললেন,রিহান! শোন বাবা! আমরা কুরআন ও সুন্নাহর আনুগত্য করি।তবে কুরআন ও সুন্নাহর কিছু বিষয় এমনও আছে যা বুঝতে জটিল।সেজন্য আমাদেরকে ‘ফিক্বহ’এর দ্বারস্থ হতে হয়।যাতে করে আমাদের ইসলামী জীবন থেমে না থাকে।এ কারণেই মুসলিমগণ,রাসূল পরবর্তী সময় হতে, এ সব বিষয়ে অভিজ্ঞ কারো ব্যাখ্যাকে মান্য করে আমল করে চলেছেন।
এ ধারায়,বিভিন্ন অঞ্চলের মুসলিমগণ,এক সময়, স্বর্ণযুগের অতি বিজ্ঞ চার ইমামের ব্যাখ্য অনুযায়ী তাঁদের মুসলিম জীবন পরিচালনা করা শুরু করেন।এখন অনভিজ্ঞ মুসলিমগণ তা করতেই বাধ্য প্রায়।কারণ সবদিক থেকে তাঁদের চেয়ে উন্নত ব্যাখ্যা আর খুঁজে পাওয়া যায় না।
এ সবের মধ্যে অন্যতম হল হানাফি ফিক্বহ।

রিহান! আমরা যেহেতু হানাফি ফিক্বহের ব্যাখ্যা মান্য করি এবং এ ফিক্বহের বিষয়গুলো আমরা বেশি বুঝি এবং বেশি জানি তাই তোমাকে সেই দৃষ্টিকোণ থেকে ইসলামের এই নিয়মটি বললাম।তোমার স্বেচ্ছায় রোযা ভঙ্গের জন্য ক্বাদ্বা’র একটি এবং এর সাথে আরো ষাটটি কাফফারার রোযা রাখার কথা বা মাসআলা তোমাকে জানিয়ে দিলাম।রাখা অথবা না রাখা তোমার ব্যাপার।তোমাকেই বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

মুহতারাম ইমাম আরো যোগ করে বললেন,শোন রিহান! পরকালের মস্ত শাস্তি থেকে এ জগতের ৬০ সিয়ামের যাতনা নেহাত তুচ্ছ।

শ্রদ্ধেয় ইমামের সুন্দর করে বুঝানোতে রিহানের মনে—পরকালের সমূহ বিপদ থেকে পরিত্রাণের এক সম্ভাবনা জাগলো।
কথা শেষ হলে পর তারা উভয়ে,শোকরিয়া জানিয়ে ইমাম মহোদয়ের কাছ থেকে বিদায় নিলেন।

বিদায় বেলা শ্রদ্ধেয় ইমাম আরো নাসীহাহ করে বললেন,শোন! মোস্ট ইম্পর্টেন্ট বিষয় হল, আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া।যা এখন থেকেই শুরু করে দিতে পারো।এবং খেলা-ধুলা ও হাসি-খুশি সবকিছু চালিয়ে যাও তবে ইসলামের নিয়ম মেনে এ সব করে।আল্লাহর অবাধ্য হয়ে নয়।

সেই বছর রামাদ্বানের পরই রিহান শুরু করে দেয় তার মুক্তির যাত্রা—কাফফারার পালা। রিহান ঠিকই ষাট রোযা শুরু করে দেয় এবং সবগুলো রোযা সে পুরাই করে নেয়।

ধার্মিক রিহান এখন আর সতেরো নয়।সতেরোর সাথে যোগ হয়েছে আরো একত্রিশ বছর।

ঘটনাচক্রের প্রবাহে,বিগত কোন এক রামাদ্বানে।রিহান তার পরিচিত আরেকজনকে বাঁচানোর প্রয়াস চালায়।সে আবারও আরেক ‘শাইখ’কে একই বিষয়ে জিজ্ঞেস করে বলে, ‘শাইখ’ আমার পরিচিত এমন কেউ আছেন যিনি স্বেচ্ছায় একটি রামাদ্বানের ভিতর কয়েকটি সিয়াম নষ্ট করে ফেলেছেন।এখন তাঁকে কতটি কাফফারা দিতে হবে?

‘শাইখ’ জবাবে বললেন,যেহেতু তিনি খাদ্য ও পানীয় গ্রহণের কারণে এ রোযাগুলো নষ্ট করেছেন সেহেতু,তাঁকে সবগুলো রোযার জন্য মাত্র একটি কাফফারা করলে চলবে তবে আল্লাহ, যিনি ঘাফফার ও ঘাফুর, সেই স্রষ্টার কাছে ভাল ভাবে মাফ চেয়ে নিতে হবে।”

পৃথিবীর মানুষের সৌভাগ্য যে,এখনো পৃথিবীতে মানুষ অনুশোচনা করে চলেছে।এখনোও প্রায়শ্চিত্তের দ্বার উম্মুক্ত আছে।এখনো মানুষের হৃদয় সৃষ্টিকর্তার ভয়ে কেঁপে উঠছে।এখনো মানুষ তাঁর মুক্তির পথ খুঁজে নিচ্ছে।

শেয়ার করুন:

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন