শনিবার, ১৫ জুন ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ | ১ আষাঢ় ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

শেষের দশ।। হাবীব নূহ



রামাদ্বানের শেষ দশে সহজ-কঠিন কিছু আমল :-

১.
রামাদ্বানের শেষের দশে ইবাদাত ও ইসলামী এবং ইসলাহী কাজে বিশেষ মনোনিবেশ করা এবং প্রস্তুতি নেওয়া।
আয়িশাহ্ রাদ্বিআল্লাহু আনহা বর্ণিত সাহীহ বুখারীর ২০২৪ হাদীস এই মর্মে নির্দেশনা দিচ্ছে যে;
“যখন রামাদ্বানের শেষ দশক আসত তখন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর
লুঙ্গি কষে নিতেন (অর্থাৎ বেশি বেশি ইবাদাতের প্রস্তুতি নিতেন) এবং রাতে জেগে থাকতেন এবং পরিবার-পরিজনকে জাগিয়ে দিতেন(জাগিয়ে রাখতেন)।”
—(সাহীহ বুখারী : ২০২৪)

[عَنْ عَائِشَةَ قَالَتْ كَانَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم إِذَا دَخَلَ الْعَشْرُ شَدَّ مِئْزَرَهُ وَأَحْيَا لَيْلَهُ وَأَيْقَظَ أَهْلَهُ]

২.
মাসজিদে ই’তিকাফ করা।
নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খুবই গুরুত্ব দিয়ে ই’তিকাফ করতেন।ই’তিকাফের বিধানের পর বিশেষ অসুবিধায় পড়া ছাড়া রামাদ্বানের ই’তিকাফ তিনি ছাড়েননি।
(দ্রষ্টব্য : সাহীহ বুখারী : ২০২০,
২০২৬, সাহীহ মুসলিম : ১১৭২, সুনান আত তিরমিযী : ৮০৩ এবং অন্যান্য হাদীস ও অন্যান্য হাদীস গ্রন্থ)

৩.
লাইলাতুল ক্বাদারের অনুসন্ধান করা:
(ক)
নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন :
عَنْ عَائِشَةَ عَنْ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ الْتَمِسُوا

তোমরা (লাইলাতুল কদর [ক্বাদর]) অনুসন্ধান কর।
—(সাহীহ বুখারী : ২০১৯)

(খ)
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন :
তোমরা রামাদ্বানের শেষ দশকের রাতগুলোতে লাইলাতুল ক্বাদারের অনুসন্ধান কর।
—(সাহীহ বুখারী : ২০২০, সাহীহ মুসলিম : ১১৬৯)

(গ)
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন :
তোমরা রামাদ্বানের শেষ দশকের বেজোড় (২১, ২৩, ২৫, ২৭ ও ২৯) রাতে লাইলাতুল ক্বাদারের অনুসন্ধান কর।
—(সাহীহ বুখারী : ২০১৭)

মোদ্দা কথা :
সাহীহ হাদীস থেকে জানা যায় যে, লাইলাতুল ক্বাদার রামাদ্বানের শেষ দশ রাতের যে কোন বিজোড় রাত্রিতে হয়ে থাকতে পারে।বিভিন্ন সাহীহ হাদীসে ২১, ২৩, ২৫, ২৭ এবং ২৯ তারিখে লাইলাতুল ক্বাদার অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা উল্লেখ আছে।হাদীসে এ কথাও উল্লেখ আছে, যে কোন একটি নির্দিষ্ট বিজোড় রাত্রিতেই তা সব সময় হয় না, অর্থাৎ কোন বছর ২৫ তারিখে হবে,আবার কোন বছর ২১ তারিখে হবে এভাবে একেক বছর একেক তারিখে হতে পারে।শুধু ২৭ তারিখের রাত্রিকে লাইলাতুল ক্বাদার হিসেবে পালন করলে মাত্র একটি রাত্রিকে বরাবর লাইলাতুল ক্বাদার ধার্য করা হয়ে যায় যা কোন হাদীসে নির্ধারিত নেই।লাইলাতুল ক্বাদারকে ৫টি বিজোড় রাতেই তালাশ করতে হবে।

৪.
লাইলাতুল ক্বাদারের মর্যাদা বুঝে তাতে প্রভূত সাওয়াব প্রাপ্তির আশা করা এবং সাওয়াব তালাশ করা :

আল্লাহ তা‘আলা কুরআনুল কারীমের ৯৭ নাম্বার পুরো সূরাটি লাইলাতুল ক্বাদার বিষয়ক পাঠিয়েছেন।তাতে ঘোষণা করেছেন- লাইলাতুল ক্বাদার হাজার মাসের (ইবাদাতের) চেয়েও উত্তম।
আর একটি এক হাজার মাসে ৮৩ বছর ৪ মাস সময় থাকে।
আর কুরআন কিন্তু বলছে এক হাজারের চেয়েও বেশি সাওয়াব বা মর্যাদা হবে।
কত বেশি হবে সেটি হয়ত নির্ধারণ হবে মুসলিমের ইখলাছ ও ঈমানের ভিত্তিতে।

সাহীহ বুখারীর ৩৫ আর সাহীহ মুসলিমের ৭৬০ হাদীসটি অনুধাবনযোগ্য :

আবূ হুরাইরাহ রাদ্বি আল্লাহু আনহু বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যিনি ঈমানের সাথে নেকির আশায় ক্বাদরের রাতে ইবাদাতে রাত্রি জাগবে, তার পূর্বের গুনাহ্ ক্ষমা করে দেয়া হবে।”

[عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ‏ “‏ مَنْ يَقُمْ لَيْلَةَ الْقَدْرِ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ ‏”‏‏.]

৫.
লাইলাতুল ক্বাদারের বিশেষ এই দু’আ চাওয়া :
আয়িশাহ রাদ্বি আল্লাহু আনহা বর্ণনা করে বলেন, আমি আল্লাহর রাসূলকে বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমি যদি লাইলাতুল ক্বাদার পেয়ে যাই (বা জানতে পারি) তাহলে সে রাতে কি পড়ব? তিনি বললেন :

“তুমি বল, হে আল্লাহ! তুমি সম্মানিত ক্ষমাকারী, তুমি মাফ করতেই পছন্দ কর, অতএব তুমি আমাকে মাফ করে দাও”

اللهُمَّ إِنَّكَ عَفُوٌّ تُحِبُّ الْعَفْوَ فَاعْفُ عَنِّى

উচ্চারণ : ‘আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুয়্যুন; তুহিব্বুল আফওয়া; ফাফু আন্নি।’
—[সুনান আত-তিরমিযী : ৩৫১৩,সুনান ইবন মাজাহ : ৩৮৫০]

৬.
অন্যান্য দুআ ও মুনাজাতে মনোযোগী হওয়া :
(কারণ—দুআও একটি বড় ইবাদাত)
৭.
ইসতেগফার ও তাওবায় গুরুত্ব দেওয়া :
(কারণ—ইসতেগফার ও তাওবাহ একটি বড় কর্তব্য।)

৮.
কুরআন তিলাওয়াত করা:

রামাদ্বান মাসেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মহান আল্লাহ’র পক্ষ থেকে আল-কুরআন প্রাপ্ত হয়েছিলেন।

(ক)
আল্লাহ বলেন:
“রামাদ্বান মাস, যাতে কুরআন নাযিল করা হয়েছে মানুষের জন্য হিদায়াতস্বরূপ এবং হিদায়াতের সুস্পষ্ট নিদর্শনাবলী এবং সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারীরূপে।
—[দ্বিতীয় সূরা আল-বাকারা : আয়াত : ১৮৫]

(খ)
আবূ হুরাইরাহ রাদ্বি আল্লাহু আনহুর বিবরণ।তিনি বলেন, প্রতি বছর (রামাদ্বানে) জিবরীল আলাইহিস সালাম নবী সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার আল-কুরআন শোনাতেন ও শুনতেন।কিন্তু যে বছর তাঁর মৃত্যু হয় সে বছর তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে দু’বার শুনিয়েছেন। প্রতি বছর নবী সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম রামাদ্বানে দশ দিন ই’তিকাফ করতেন।কিন্তু যে বছর তাঁর ওফাত হয় সে বছর তিনি বিশ দিন ই’তিকাফ করেন।
—(সাহীহ বুখারী : ৪৯৯৮)

[عَنْ أَبِيْ هُرَيْرَةَ قَالَ كَانَ يَعْرِضُ عَلَى النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم الْقُرْآنَ كُلَّ عَامٍ مَرَّةً فَعَرَضَ عَلَيْهِ مَرَّتَيْنِ فِي الْعَامِ الَّذِيْ قُبِضَ فِيْهِ وَكَانَ يَعْتَكِفُ كُلَّ عَامٍ عَشْرًا فَاعْتَكَفَ عِشْرِيْنَ فِي الْعَام الَّذِيْ قُبِضَ فِيْهِ]

৯.
কুরআনের কিছু বিশেষ মর্যাদা-পূর্ণ সূরা ক্বিরাত বা তিলাওয়াত করা যেতে পারে, যেমন :
(ক)
সূরা যিল্‌যাল (৯৯ নাম্বার সূরা), সূরা কাফিরুন(১০৯ নাম্বার সূরা),সূরা ইখলাছ(১১২ নাম্বার সূরা) তিলাওয়াত করা :

ইবনু আব্বাস রাদ্বি-আল্লাহু আনহু বর্ণনা করে বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন :
সূরা ইযা যুলযিলাতিল আরদু কুরআনের অর্ধেকের সমান, কুল হুওয়াল্লাহু আহাদ এক-তৃতীয়াংশের সমান এবং কুল ইয়া আইয়ুহাল কাফিরূন এক-চতুর্থাংশের সমান।
—(সুনান আত-তিরমিযী : ২৮৯৪)

(খ)
সুরা বাকারার শেষ দুই আয়াত তিলাওয়াত করা যেতে পারে :

“যে লোক রাতে সূরা আল বাকারার শেষ দু’টি(২৮৫-৮৬) আয়াত তিলাওয়াত করবে তা তার জন্য যথেষ্ট হবে।”
—(সাহীহ বুখারী : ৫০৪০)

(গ)
উল্লিখিত সূরা সমূহ ছাড়াও অন্যান্য সূরা তিলাওয়াত করা যেতে পারে।
(কারণ—কুরআনের প্রতিটি অক্ষর তিলাওয়াতের বিনিময় দশ থেকে নিয়ে অজস্র আছে।)

১০.
যাকাত, ছাদাক্বাহ ও দান-খাইরাত করা:
(কারণ—এ সবের সাওয়াব অপরিসীম।এবং আপদ-বিপদের প্রতিরক্ষা ও পরিত্রাণের ব্যবস্থা।)

১১.
পিতা-মাতার সযত্ন পরিচর্যা ও খিদমাত করা।
(কারণ—সমূহ মঙ্গল ও সুখ লাভের একান্ত এবং সদর দরজা)

১২.
অন্যের খিদমাত বা সেবা করা।এমনকি অন্য জীব-জন্তু অথবা পরিবেশের।
(কারণ—খিদমাতের সাওয়াব অতুলনীয়)

১৩.
ছাদাক্বাতুল ফিতর আদায় করা যেতে পারে :
সাওমের পবিত্রতাস্বরূপ সাওম পালনকারীকে ছাদাক্বাতুল ফিতর আদায় করা ওয়াজিব। এ সদকা দ্বারা গরীব মিসকীনদেরকে ঈদের আনন্দে শামিল করা হয়।
ঈদের সালাতের পূর্বেই এই ফিতরা আদায় করা সুন্নাত। তবে বিলম্ব হলে ঈদের পরেও তা আদায় করা যায়।
আবদুল্লাহ ইবনু ‘উমার রাদ্বি-আল্লাহু বর্ণনা করে বলেন : “নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লোকদেরকে ঈদের সালাতের জন্য বের হওয়ার পূর্বেই ছাদাক্বাতুল ফিতর আদায় করার নির্দেশ দেন।”
—(সাহীহ বুখারী : ১৫০৯)

১৪.
কুরআনের দুআ, মাসনুন বা সুন্নাহ দুআ, নির্দিষ্ট সময়ের দুআ এবং তাসবীহ, তাহলীল ও তাকবীর পড়া বা জপা।
(কারণ—এগুলো আল্লাহর নৈকট্য পাওয়ার মাধ্যম।)

১৫.
দুরুদ বা সালাওয়াত আলান নাবী যথাসম্ভব অধিক পাঠ করা।
(কারণ—এর উপকার অফুরন্ত।সর্বোপরি আল্লাহর রাহমাত ও বারাকাত কাছে নিয়ে আসে।)

১৬.
নাওয়াফিল বা অনেক ধরণের নফল সালাত আছে সেগুলো যথাসম্ভব আদায় করা।
(কারণ—এর কন্যাণ অশেষ।এবং আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের বিশেষ দরোজা।)

১৭.
ধর্মীয় বিষয় শিক্ষা ও অধ্যয়ন।
(কারণ—-এটি নেহাত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব-কর্তব্য।যার দ্বারা দ্বীন বুঝা এবং হিদায়াতের পথে চলা সহজ ও সম্ভব হয়)।

লেখক: মুফতি

শেয়ার করুন:

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন