শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
Sex Cams

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনায় পাকিস্তান কি সংঘাতে জড়াবে? সৌদি ইস্যুতে বাড়ছে উদ্বেগ



ছবি :সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের চলমান উত্তেজনা মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে অস্থিতিশীলতা তৈরি করতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে পাকিস্তানকে ঘিরেও। বিশেষ করে ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের সাম্প্রতিক সৌদি আরব লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর ইসলামাবাদের উদ্বেগ আরও বেড়েছে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, পরিস্থিতি আরও জটিল হলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তানের অবস্থান কঠিন হয়ে উঠতে পারে। কূটনৈতিক ও নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, গত মাসে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে উত্তেজনা প্রশমনের লক্ষ্যে একটি অন্তর্বর্তী সমঝোতা প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টায় ইসলামাবাদ ভূমিকা রেখেছিল।

পাকিস্তানের সঙ্গে সৌদি আরবের পারস্পরিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তি কার্যকর রয়েছে। একই সঙ্গে দেশটিতে হাজারো পাকিস্তানি সেনাসদস্য এবং একটি যুদ্ধবিমান স্কোয়াড্রন মোতায়েন রয়েছে। অতীতে সৌদি আরবে ইরান-সমর্থিত হামলার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করলেও, হুতিদের সাম্প্রতিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর সেই শঙ্কা আরও বেড়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

হুতিদের দাবি, সোমবার তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন একটি বিমানবন্দরে সৌদি বাহিনী হামলা চালায়। এর জবাবে তারা সৌদি আরব লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। প্রায় চার বছর ধরে কার্যকর যুদ্ধবিরতির পর এটিই প্রথম সীমান্তপারের হামলার ঘটনা, যদিও এখন পর্যন্ত এটি বিচ্ছিন্ন ঘটনাই রয়েছে।

রয়টার্সের সঙ্গে কথা বলা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পাকিস্তানি কর্মকর্তা জানান, দেশটির শীর্ষ বেসামরিক ও সামরিক নেতৃত্ব ইরানকে স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে, সৌদি আরবের ওপর হামলাকে পাকিস্তান নিজেদের নিরাপত্তার জন্যও হুমকি হিসেবে বিবেচনা করবে। তাদের ভাষায়, এটি ইসলামাবাদের জন্য একটি ‘রেড লাইন’।

পাকিস্তানি নিরাপত্তা বিশ্লেষক মুহাম্মদ আমির রানা বলেন, পরিস্থিতি এত দ্রুত উত্তপ্ত হবে—এমনটি ইসলামাবাদ আগে থেকে ধারণা করেনি।

কর্মকর্তাদের মতে, সৌদি-ইয়েমেন সীমান্তের কাছে পাকিস্তানি সেনাসদস্য মোতায়েন থাকায় হুতিদের হামলা অব্যাহত থাকলে তারাও সরাসরি ঝুঁকির মুখে পড়তে পারেন। একই সঙ্গে লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌবাণিজ্য পথও বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যার ওপর পাকিস্তানসহ বহু দেশের বাণিজ্য নির্ভরশীল।

বিশ্লেষকদের মতে, সংঘাত আরও বিস্তৃত হলে সৌদি আরবের সঙ্গে বিদ্যমান প্রতিরক্ষা চুক্তির কারণে পাকিস্তান সামরিক সহায়তার চাপের মুখে পড়তে পারে।

অবসরপ্রাপ্ত পাকিস্তানি জেনারেল গুলাম মুস্তফা বলেন, আপাতত ইসলামাবাদের শীর্ষ নেতৃত্ব সব পক্ষকে সংযত রাখার চেষ্টা করছে। তবে হুতিদের হামলার মাত্রা বৃদ্ধি পেলে পরিস্থিতির বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটতে পারে।

এদিকে পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের মতে, ইরানের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এর মধ্যে নীতিগত বিভাজনও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। তাদের ধারণা, দেশটির সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় সামরিক বাহিনীর প্রভাব ক্রমেই বাড়ছে।

বর্তমান উত্তেজনার প্রভাব কূটনৈতিক যোগাযোগেও পড়েছে। চলতি সপ্তাহের শুরুতে ইরানের একটি প্রতিনিধিদলের ইসলামাবাদ সফর পিছিয়ে গেলেও পরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসকান্দার মোমেনির নেতৃত্বে প্রতিনিধি দলটি বুধবার পাকিস্তান সফর করে। ওই বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্ক ও সম্ভাব্য সমঝোতার বিষয়েও আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।

পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র তাহির আন্দ্রাবি বলেছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে সব পক্ষের সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শন করা প্রয়োজন। তার মতে, সংলাপ ও কূটনীতির মাধ্যমেই টেকসই সমাধান সম্ভব।

বিশ্লেষকদের ভাষ্য, পাকিস্তান মধ্যপ্রাচ্যে আরও সক্রিয় কূটনৈতিক ভূমিকা রাখতে আগ্রহী হলেও এর ফলে আঞ্চলিক সংকটের চাপও বাড়ছে। গত সেপ্টেম্বরে সৌদি আরবের সঙ্গে স্বাক্ষরিত প্রতিরক্ষা চুক্তিকে উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হয়।

অন্যদিকে জ্বালানি আমদানির ক্ষেত্রে পাকিস্তান ব্যাপকভাবে মধ্যপ্রাচরের ওপর নির্ভরশীল। হরমুজ প্রণালী ঘিরে চলমান উত্তেজনার কারণে ইতোমধ্যে দেশটির জ্বালানি সরবরাহে প্রভাব পড়েছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার জরুরি প্রস্তুতিও গ্রহণ করেছে।

কর্মকর্তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল উত্তেজনা কমানোর পাশাপাশি হরমুজ প্রণালী হয়ে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা।

রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এক পাকিস্তানি কর্মকর্তা বলেন, মধ্যস্থতা প্রক্রিয়ায় ইসলামাবাদ এখনো প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তার ভাষায়, ‘হতাশা থাকলেও আমরা এই উদ্যোগ থেকে সরে যাচ্ছি না। এতে আমাদের উল্লেখযোগ্য কূটনৈতিক বিনিয়োগ রয়েছে এবং এটি অব্যাহত রাখার স্বার্থও আমাদের আছে।’

তবে বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে গেলে শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানকে এক পক্ষের পাশে দাঁড়ানোর কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে। মধ্যস্থতা প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের দাবি, যুদ্ধের অবসান সবার স্বার্থে হলেও সৌদি আরব আনুষ্ঠানিকভাবে সহায়তা চাইলে ইসলামাবাদ তাদের সমর্থনেই এগোবে।

শেয়ার করুন:

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

error: Content is protected !!