রবিবার, ২ অগাস্ট ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৮ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
Sex Cams

ইরানে নতুন হামলা স্থগিত ট্রাম্পের, দ্রুত চুক্তির ইঙ্গিত



ছবি :সংগৃহীত

ইরানে নতুন করে হামলা চালানোর পরিকল্পনা আপাতত স্থগিত করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি জানিয়েছেন, কয়েক মাস ধরে চলা সংঘাতের অবসানে দ্রুত একটি চুক্তি হলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানে আর হামলা চালাবে না।

রোববার (২ আগস্ট) ভোরে নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প দাবি করেন, ইরানসহ মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশ তাকে নতুন করে হামলা না চালানোর অনুরোধ জানিয়েছে। তার ভাষ্য, একটি চুক্তির কাঠামোতে সম্মতি তৈরি হওয়ায় তিনি হামলা স্থগিতের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

তবে ট্রাম্পের এই দাবি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে তেহরান। ইরানের সামরিক কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হামলা বন্ধের অনুরোধ করার দাবি ‘নতুন একটি মিথ্যা’। একই সঙ্গে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে এবং যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুত বলেও জানানো হয়েছে।

ট্রাম্পের প্রস্তাবিত চুক্তির বিস্তারিত এখনো প্রকাশ করা হয়নি। তবে তিনি জানিয়েছেন, এর অন্যতম শর্ত হবে হরমুজ প্রণালি অবিলম্বে ও পুরোপুরি খুলে দেওয়া এবং ইরানের পারমাণবিক হুমকির অবসান। ইসরাইলও এ অবস্থানের সঙ্গে একমত বলে দাবি করেছেন তিনি।

হামলা স্থগিতের কারণ কী?

এর আগে ট্রাম্প জানিয়েছিলেন, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নিতে যুক্তরাষ্ট্র পুরোপুরি প্রস্তুত। তবে পরবর্তী পোস্টে তিনি বলেন, ইরান ও মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশের অনুরোধ এবং বিশ্বে দীর্ঘমেয়াদি শান্তির স্বার্থে তিনি নতুন হামলা বাতিল করেছেন। একই সঙ্গে দ্রুত একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর শর্তও দিয়েছেন।

তবে ওই চুক্তির শর্তাবলি কী হবে, কিংবা আলোচনায় কারা মধ্যস্থতা করছে—এ বিষয়ে হোয়াইট হাউস বা ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি।

এদিকে মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শনিবার সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ট্রাম্পের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন। এ সময় তিনি ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য বড় ধরনের নতুন হামলা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং উত্তেজনা কমিয়ে সামরিক পদক্ষেপ থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান।

যুক্তরাষ্ট্রের জন্য আরেকটি উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে সামরিক সরঞ্জামের মজুত। বিশেষ করে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে ব্যবহৃত ‘প্যাট্রিয়ট অ্যান্টি-মিসাইল ইন্টারসেপ্টর’ দ্রুত কমে আসছে। সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের তথ্য অনুযায়ী, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর আগে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে প্রায় ২ হাজার ৩০০টি প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর ছিল। বর্তমানে সেই মজুত ৮২৭টির নিচে নেমে এসেছে।

ডেমোক্র্যাট দলীয় মার্কিন সিনেটর ক্রিস ভ্যান হোলেনও সতর্ক করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র দ্রুত এসব ইন্টারসেপ্টর ব্যবহার করে ফেলছে। অথচ মার্কিন সেনাদের সুরক্ষার জন্য এগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং বিশ্বের অন্যান্য সম্ভাব্য সংঘাতের ক্ষেত্রেও এসব অস্ত্রের প্রয়োজন হতে পারে।

ইরানের অবস্থান কী?

ট্রাম্পের হামলা স্থগিতের ঘোষণা কিংবা কথিত চুক্তি নিয়ে তেহরান এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি। তবে ইরানের ভারপ্রাপ্ত প্রতিরক্ষামন্ত্রী মজিদ ইবনে আল-রেজা বলেছেন, শত্রুপক্ষের যেকোনো হুমকিকে ইরান বাস্তব ও বিশ্বাসযোগ্য হিসেবে বিবেচনা করছে। এমনকি কোনো হুমকি মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের অংশ হলেও তা গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত বক্তব্যে তিনি বলেন, ইরান কোনোভাবেই অপ্রস্তুত বা নিষ্ক্রিয় থাকবে না।

এর আগে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির, তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান এবং সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফয়সাল বিন ফারহান আল সৌদের সঙ্গে আলাদাভাবে ফোনে কথা বলেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র কোনো দুঃসাহসিক পদক্ষেপ নিলে এবং ইরানের লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালালে তেহরানও কঠোর জবাব দেবে।

ইরানের শীর্ষ নিরাপত্তা সংস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যম নুরনিউজের এক প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোয় মার্কিন হামলা হলে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার ও ইসরাইলের তেল-গ্যাস স্থাপনায় পাল্টা হামলা চালানো হতে পারে।

কোন চুক্তির ইঙ্গিত দিচ্ছেন ট্রাম্প?

ট্রাম্প যে চুক্তির কথা বলেছেন, সেটি নিয়ে এখনো কোনো পক্ষই পরিষ্কার ধারণা দেয়নি। তবে কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, তুরস্ক ও পাকিস্তানসহ কয়েকটি আঞ্চলিক দেশ যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে উত্তেজনা কমিয়ে আলোচনার টেবিলে ফেরার আহ্বান জানিয়ে আসছে।

রোববার পাকিস্তানের সরকারি সূত্রের বরাত দিয়ে তুরস্কের আনাদোলু সংবাদ সংস্থা জানায়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনা পুনরায় শুরু হতে পারে—এমন সম্ভাবনা নিয়ে পাকিস্তানি ও কাতারি মধ্যস্থতাকারীদের মধ্যে সতর্ক আশাবাদ তৈরি হয়েছে।

এর আগে গত জুনে ইসলামাবাদ ও দোহার মধ্যস্থতায় একটি যুদ্ধবিরতির উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে মতবিরোধই ওই উদ্যোগ ব্যর্থ হওয়ার অন্যতম কারণ বলে জানা যায়।

বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ দিয়ে বৈশ্বিক তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় ২০ শতাংশ পরিবহন হয়। ট্রাম্পের সর্বশেষ বক্তব্য অনুযায়ী, নতুন চুক্তি হলে হরমুজ প্রণালি দ্রুত খুলে দেওয়া হবে।

তবে তেহরান আগে জানিয়েছে, এই জলপথ যুদ্ধের আগের অবস্থায় আর ফিরবে না। ওমানের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রণালিতে সামুদ্রিক যান চলাচল নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে ইরান আগ্রহ দেখালেও ট্রাম্প ও উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্ররা এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে।

সংঘাতের অবসান কি সত্যিই কাছে?

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত শুরুর প্রায় পাঁচ মাস পার হলেও এখনো স্থায়ী সমাধানের কোনো স্পষ্ট পথ দেখা যাচ্ছে না। আলজাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তেহরান একদিকে কূটনৈতিক তৎপরতা চালাচ্ছে, অন্যদিকে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে কঠোর অবস্থান প্রকাশ করেছে।

মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো রস হ্যারিসনের মতে, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক কৌশল এখনো স্পষ্ট নয়। কারণ ট্রাম্প একাধিকবার বড় ধরনের হামলার হুমকি দেওয়ার পরও শেষ পর্যন্ত পিছু হটেছেন।

তার মতে, ইরান হয়তো মনে করছে সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা থেকেই ট্রাম্প নতুন হামলা থেকে সরে এসেছেন। তবে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার বিষয়ে স্পষ্ট ও কার্যকর কোনো চুক্তি না হলে ট্রাম্পের সর্বশেষ ঘোষণা কেবল সাময়িক বিরতিতেই সীমাবদ্ধ থাকতে পারে।

হ্যারিসন আরও সতর্ক করেছেন, সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে তেহরান ও ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারকদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে পরিস্থিতি চলে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। দুই পক্ষ উত্তেজনা কমাতে চাইলেও সংঘাতে জড়িত অন্য পক্ষগুলো নতুন করে উত্তেজনা বাড়িয়ে দিতে পারে। ফলে ট্রাম্পের ঘোষিত হামলা স্থগিতের সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত স্থায়ী শান্তির পথে কতটা এগোয়, এখন সেটিই দেখার বিষয়।

শেয়ার করুন:

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

error: Content is protected !!