
ছবি :সংগৃহীত
ঢাকা, ৫ অক্টোবর ২০২৬: ‘সর্বজনীন বাসস্থান, টেকসই নগরায়ণ’ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে আজ সোমবার বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে বিশ্ব বসতি দিবস। প্রতিবছর অক্টোবরের প্রথম সোমবার এ দিবসটি পালন করা হয়।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ১৯৮৫ সালে অক্টোবরের প্রথম সোমবারকে বিশ্ব বসতি দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেয়। এর পরের বছর, ১৯৮৬ সাল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। প্রতিবছরই দিবসটির জন্য আলাদা প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়। প্রথমবার কেনিয়ার নাইরোবিতে ‘বাসস্থান আমার অধিকার’ প্রতিপাদ্যে বিশ্ব বসতি দিবস পালিত হয়েছিল। বাংলাদেশেও দিবসটি উপলক্ষে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে বিভিন্ন কর্মসূচি নেওয়া হয়।
এ বছর দিবসটি উপলক্ষে ঢাকার বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে উদযাপন অনুষ্ঠান ও বসতি মেলার আয়োজন করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মেলার উদ্বোধন করবেন।
মানুষের নিরাপদ আশ্রয়, খাদ্য উৎপাদন, সামাজিক জীবন এবং পারস্পরিক সহযোগিতার প্রয়োজন থেকেই মানব বসতির বিকাশ। একটি নির্দিষ্ট এলাকায় মানুষ স্থায়ীভাবে একত্রে বসবাস করলে তাকে মানব বসতি বলা হয়। ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য ও জীবিকার ধরন অনুযায়ী মানব বসতি মূলত গ্রামীণ ও শহুরে—এই দুই ধরনের।
যেসব বসতিতে অধিকাংশ মানুষ কৃষিসহ প্রাথমিক পর্যায়ের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর নির্ভরশীল, সেগুলো গ্রামীণ বসতি। অন্যদিকে, যেসব এলাকায় অধিকাংশ মানুষ সরাসরি ভূমি ব্যবহারের সঙ্গে যুক্ত না থেকে বিভিন্ন অকৃষিকাজে নিয়োজিত থাকেন, সেগুলো শহুরে বসতি হিসেবে পরিচিত।
বাংলাদেশে দ্রুত নগরায়ণের কারণে আবাসনের চাহিদা ক্রমেই বাড়ছে। তবে সবার জন্য নিরাপদ, পর্যাপ্ত ও সাশ্রয়ী আবাসন নিশ্চিত করা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে নিম্নবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষের জন্য শহরাঞ্চলে সাশ্রয়ী আবাসনের সুযোগ তুলনামূলকভাবে সীমিত।
এর সঙ্গে অপরিকল্পিত নগরায়ণ, জলাশয় ও কৃষিজমি ভরাট, যানজট, নাগরিক সেবার অসম বণ্টন এবং ঢাকাকেন্দ্রিক কর্মসংস্থান নগরজীবনে বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু নতুন আবাসিক এলাকা গড়ে তুললেই আবাসন সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। নিম্নআয়ের মানুষের আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনায় ছোট ও সাশ্রয়ী আবাসন ইউনিট নির্মাণের পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি প্রকল্পে তাদের জন্য জমি ও আবাসনের ব্যবস্থা রাখতে হবে। একই সঙ্গে পরিকল্পিত নগরায়ণ নিশ্চিত করাও জরুরি।
এবারের বিশ্ব বসতি দিবসের প্রতিপাদ্য বাংলাদেশের বাস্তবতায় বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। দ্রুত নগরায়ণের চাপ সামাল দিতে সাশ্রয়ী আবাসন, পরিকল্পিত নগর উন্নয়ন, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং নাগরিক সুবিধার সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।
নগরপরিকল্পনাবিদরা মনে করেন, ঢাকাকেন্দ্রিক উন্নয়নের প্রবণতা কমিয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল ও শহরে কর্মসংস্থান, শিল্পায়ন এবং নাগরিক সুবিধা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে আবাসন সম্প্রসারণের নামে কৃষিজমি, জলাশয় ও জলাভূমি ধ্বংস বন্ধে কঠোর ভূমি ব্যবস্থাপনা ও নগর পরিকল্পনা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় আবাসন বলতে শুধু একটি ঘর নির্মাণকে বোঝায় না। নিরাপদ বাসস্থানের পাশাপাশি যোগাযোগব্যবস্থা, পানি সরবরাহ, পয়ঃনিষ্কাশন, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, খেলার মাঠ এবং অন্যান্য নাগরিক সুবিধাও এর অংশ। তাই আবাসন পরিকল্পনার সঙ্গে অবকাঠামো ও নাগরিক সেবার উন্নয়নকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
ওয়ার্ল্ড আরবানাইজেশন প্রস্পেক্টস ২০২৫-এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় বর্তমানে প্রায় ৩ কোটি ৬৬ লাখ মানুষ বসবাস করছে।
২০০০ সালে প্রায় ১ কোটি ৭৪ লাখ জনসংখ্যা নিয়ে ঢাকা বিশ্বের নবম জনবহুল নগর ছিল। ২৫ বছরের ব্যবধানে শহরটি বিশ্বের জনবহুল নগরগুলোর তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে উঠে এসেছে। এ সময়ে ঢাকার জনসংখ্যা বৃদ্ধির বার্ষিক হার ছিল ২ দশমিক ৯৬ শতাংশ।
জনসংখ্যা বৃদ্ধির এই প্রবণতা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে। একই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০৫০ সালে ঢাকা বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল নগরীতে পরিণত হতে পারে। সে সময় শহরটির জনসংখ্যা প্রায় ৫ কোটি ২১ লাখে পৌঁছানোর পূর্বাভাস রয়েছে।
নগরবিদদের মতে, ঢাকার আবাসন সংকট ও জনসংখ্যার চাপ কমাতে শুধু আবাসনের সরবরাহ বাড়ানো যথেষ্ট নয়। দেশের অন্যান্য অঞ্চল ও শহরে কর্মসংস্থান ও শিল্পায়নের সুযোগ তৈরি করতে হবে। মানুষ যাতে জীবিকা ও প্রয়োজনীয় নাগরিক সুবিধার জন্য বাধ্য হয়ে ঢাকামুখী না হয়, সে জন্য আঞ্চলিক উন্নয়ন জোরদার করা জরুরি।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বাসসকে বলেন, সবার জন্য বাসস্থান নিশ্চিত করতে হলে ঢাকাকেন্দ্রিক উন্নয়ন কমিয়ে বিকেন্দ্রীকরণের দিকে যেতে হবে। চাকরি, শিল্প এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা দেশের বিভিন্ন শহর ও অঞ্চলে ছড়িয়ে দেওয়ার পাশাপাশি নগরের জনসংখ্যা ও প্রবৃদ্ধি পরিকল্পিতভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
তিনি বলেন, নিম্নবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষের আর্থিক সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ছোট ও সাশ্রয়ী আবাসন ইউনিট নির্মাণে সরকারি উদ্যোগ বাড়ানো প্রয়োজন। সরকারি-বেসরকারি আবাসন প্রকল্পে এ শ্রেণির মানুষের জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ জমি ও আবাসনের ব্যবস্থা রাখার বিষয়টিও বিবেচনা করা উচিত।
অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান আরও বলেন, আবাসন গড়ে তুলতে গিয়ে কৃষিজমি, জলাশয় ও জলাভূমি ধ্বংস করা যাবে না। কোন এলাকায় আবাসন গড়ে উঠবে আর কোন এলাকায় হবে না—এ বিষয়ে কঠোর নগর পরিকল্পনা ও ভূমি ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন। নতুন আবাসিক এলাকা সম্প্রসারণের পাশাপাশি বিদ্যমান শহরগুলোর পরিকল্পিত উন্নয়নেও গুরুত্ব দিতে হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিম্নআয়ের মানুষের আবাসন নিশ্চিত করতে সরকারি নীতিতে তাদের প্রয়োজন ও আর্থিক সক্ষমতাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। পাশাপাশি বেসরকারি আবাসন প্রকল্পেও নিম্নবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষের জন্য নির্দিষ্ট জমি ও আবাসন ইউনিট রাখার ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
বিশ্ব বসতি দিবস মূলত মানুষের বাসস্থান ও বসবাসের পরিবেশ নিয়ে সচেতনতা তৈরির সুযোগ তৈরি করে। বাংলাদেশের মতো দ্রুত নগরায়ণশীল দেশে নিরাপদ, সাশ্রয়ী ও টেকসই আবাসন নিশ্চিত করার পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব ও পরিকল্পিত নগর গড়ে তোলাই এখন অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।


