বুধবার, ৫ অক্টোবর ২০২২ খ্রিস্টাব্দ | ২০ আশ্বিন ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

ঈদোৎসব, পালাবদল এবং প্রত্যাশা



কাইয়ুম আব্দুল্লাহ

ঈদ। শাব্দিক অর্থ আনন্দ, উৎসব। আরবী ভাষার শব্দ হলেও এটি এখন সব ভাষাভাষী মুসলমানদের উৎসবের প্রতীক। বছরে দুই ঈদ মুসলিম বিশ্বে আনন্দের বার্তা নিয়ে আসে। এক সময় এই ঈদোৎসব কেবলই নিজেদের মধ্যে চর্চায় সীমাবদ্ধ থাকলেও বিশ্ববাস্তবতায় তা এখন সর্বজনিনতায় ব্যাপকতা পাচ্ছে।

ধরা যাক আমাদের কালের ঈদ। সময়ের দ্রাঘিমায় যদিও এর স্থিতি খুব বেশী নয়। তবু কেমন তাড়াতাড়ি সবকিছু যেন পাল্টে যাচ্ছে। একসময়ের হইহুল্লোড়ে সময় পার করে দেয়ায় ওস্তাদ তরুণ-যুব সমাজ এখন বেশীরভাগই আত্মকেন্দ্রিক ও অন্তরমুখী। শুধু তরুণ কিম্বা যুবসমাজই নয়, প্রায় সব বয়সের নারী-পুরুষই আন্তর্জালিক বায়োস্কুপের নেশায় আচ্ছন্ন।সেখানেই সব দর্শন এবং গ্রহণ, বর্জন।

ঈদের সাথে চাঁদের সম্পর্ক খুব ঘনিষ্ট ও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ঈদুল ফিতরের। কারন ঈদুল আযহা বা কুরবানির ঈদ তারিখ নির্ভর হলেও ঈদুল ফিতর চাঁদ দেখা সাপেক্ষ। একসময় ঈদোৎসব্র আগের চাঁদ দেখা ছিলো আরেক উৎসব। বাংলা সাহিত্যের অন্যতম নন্দিত লেখক, কবি আলী আহসানের ঈদবিষয়ক একটি স্মৃতিচারনমূলক লেখায় পড়েছিলাম-তাদের সময়ে নাকি ঈদের চাঁদ খোঁজার কাজটি হতো আনুষ্ঠানিকভাবে। সন্ধ্যার সাথে সাথেই সবাই খোলা মাঠে জড়ো হয়ে যেতেন। আর চাঁদ দেখার পর তা ডাকঢোল পিঠিয়ে জানান দেয়া হতো।

খুব বেশী দূরে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। এই আমাদের শৈশবের কথাই যদি বলি- সেখানেও এর খুব ব্যত্যয় ছিলো না। সন্ধ্যায় মাগরিবের নামাজের পরই মসজিদের মিনারে উঠে কিংবা গ্রামের বড় রাস্তায় দাঁড়িয়ে চাঁদ দেখার প্রতিযোগিতা চলতো। সন্ধ্যার মেহগনি দিগন্তের দিকে তাকাতে তাকাতে ক্লান্ত কেউ যখন চাঁদ দেখার সংবাদ ঘোষণা করতো তখন কী আনন্দ হতো তা ভাষায় বর্ণনা করার মতো নয়। আর না দেখতে পেলে হতাশ হয়ে শুরু হতো রেডিও শোনা, কোথাও থেকে যদি চাঁদ দেখার সংবাদ আসে।

ঈদ আনন্দের আমেজটি একসময় মূলত গ্রামবাংলায়ই বেশী করে ধরা দিতো। যেমন চাঁদ দেখার বিষয়; উন্মুক্ত প্রান্তরে খোলাকাশে নও হেলালের দর্শন। যদিও এই অভাবনীয় সুন্দর সংস্কৃতি অনেক আগেই বিদায় নিয়েছে। এমনিতেই শহরে সুউচ্চ দালান কালো মেঘের একাকারে ছোট্ট নতুন চাঁদ খালিচোখে দেখার সুযোগ কম। আর গ্লোবালাইজেশনের কারনে গ্রামগুলোও আর আগের গ্রামীণ বৈশিষ্ট্যে নেই। তাই চাঁদের খবর জানার জন্য প্রায় পুরোটাই টেকনোলজির উপর নির্ভরশীল। বিভিন্ন ধরনের সার্চ শেষে হেলাল কমিটির ঘোষণাই এখন একমাত্র মাধ্যম এবং তারই প্রতীক্ষায় ক্ষণ গোণা। ঈদের দিনে দলবেঁধে বেড়ানো সংস্কৃতিরও ইতি হয়েছে। চাঁদ দেখার সংবাদ ঈদের সালাম, শুভেচ্ছা সবকিছুর আদান-প্রদান চলে বায়ুবীয়ভাবে, সামাজিক নেটওর্য়াকের কল্যাণে। তবে বাংলাদেশে এখনো বড়দাগে যে বিষয়টি চোখে পড়ে তা হচ্ছে- গ্রামে ফেরা। নানা ভোগান্তি আর পথের দুর্ভোগ উপেক্ষা করে শহুরে মানুষরা এখনো ঈদে গ্রামে ছুটেন যান আত্মীয়-স্বজনের সাথে ঈদ করতে। ট্রেন-লন্চের উপচেপড়া ভিড়ই তার প্রমাণ। কিন্তু সেই প্রাণখোলা আনন্দের বহমান ধারা গ্রাম থেকেও উবে যাচ্ছে। গ্লোবালাইজেশন আর প্রযুক্তির প্রাচর্যতা ও প্রাদুর্ভাবে শহরের ন্যায় সমান ব্যস্ততা এখন গ্রামীণ জনপদেও।

আমাদের শৈশবে ঈদের রাত ছিলো অনেকটা ঘুমহীন রাতের একটি। বিশেষ করে ঈদের রাতে বরফ শীতল ঠান্ডা রাতেও কার আগে কারা গোসল করতে পারে সে নিয়ে চলতো জোর প্রতিযোগিতা। আশপাশের বাডিগুলোর পুকুরে শেষ রাতের পানির ঝুমুর ঝুম শব্দে বোঝাতে যেতো সেই প্রতিযোগিতার স্বরূপ। অবশ্য অন্চল বেধে ঈদ রাতের আনন্দ উদযাপনে ভিন্নতা ছিলো। চাঁদ দেখা নিয়ে তেমন আগ্রহ আর প্রকাশ না পেলেও এখনও চান রাতের কথা আলোচিত হতে দেখা যায়। তবে তা বাণিজ্যিক কারনে। বিশেষ করে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা নানা সাজে বিপনীবিতানগুলোকে অন্যরকম চাঁদের আলোয় ভাসিয়ে চান রাতে বাজিমাতের অপেক্ষায় থাকেন।

এই বিলেতে এক সময় রোজা, রমজান, ঈদ; এসবের কোনো আনুষ্ঠানিকতার কল্পনাও করতে পারতেন না পরিবার, আপনজনহীন আমাদের অগ্রজরা। এখন মসজিদে মসজিদে রাতভর খতম তারাবিহ ঈদের আনুষ্ঠানিকতায় কোনো ব্যত্যয় ঘটে না। বিশেষ করে ইদানিং সামারে ঈদগাহের ন্যায় খোলা প্রান্তরে ঈদের জামাআত তথা ঈদ ইন পার্ক বাড়তি আমেজ সৃষ্টি করছে। শুধু তাই নয়, ইফতার ও ঈদোৎসবে অন্যান্য কমিউনিটির সম্পৃক্ততায় তা সর্বজনিনতা রূপ লাভ করছে। নানা রঙয়ের নতুন পোষাকে সজ্জিত হয়ে শিশু-কিশোর, তরুণ-তরুণী ও নারী-পুরুষের ঘুরে বেড়ানো এবং নিমন্ত্রিত হয়ে একে অন্যের ঘরে যাতায়াতের মনোরম দৃশ্য অবলোকনে কোথাও আনন্দের কমতি আছে বলে হয় না। তবে হলিডে তথা সরকারি ছুটি না হওয়ায় অনেকেই রিলাক্সড মনে উৎসবকে উপভোগ করতে পারছেন না। তাদেরকে অনেকটা তাড়াহুড়োয় সম্পন্ন করতে হচ্ছে সব আনুষ্ঠানিকতা। তবে এর পরিধি যেভাবে বাড়ছে একদিন তা পরিপূর্ণ আঙ্গিকে উদযাপিত হবে বলে আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস।

এক্ষেত্রে বিশেষ করে বৃটিশ মুসলিমদের উদার মানসিকতা প্রশংসার দাবীদার। রামাদ্বানে বিভিন্ন ধর্মের মানুষের অংশগ্রহণে ইফতার এবং ল-নের প্রাণকেন্দ্র ট্রাফালগার স্কয়ারে ঈদ গ্যাদারিং অনুষ্ঠানসহ বিভিন্ন কর্মসূচীই এর উজ্জ¦ল দৃষ্টান্ত।

পরিশেষে বলতে চাই, বছর পরিক্রমায় ঈদ ফিরে এসেছে ঠিকই কিন্তু ঈদের সেই প্রকৃত আনন্দকে আলিঙ্গন করতে পারছে না পুরো বিশ্ব মুসলিম। বিশেষ করে যুগ-যুগান্তর থেকে নির্যাতিত ফিলিস্তিন, যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়া ও ইরাক, বহুদিন থেকে আগ্রাসন আক্রান্ত আফগানিস্তান, স্বাধীনতা পিপাসু কাশ্মিরসহ মুসলিম বিশ্বের বিশাল মানচিত্রের ঈদের চাঁদের উঁকি দিলেও তা খালি চোখে দেখার কোনো সুযোগ নেই। কারন, সেসব দেশের সন্ধ্যাকাশ ঢাকা পড়ে থাকে কারবালার রক্তিম কারুকাজে। তাদের বরং আনন্দের বদলে গুলি-বোমাকে আলিঙ্গন করতে হচ্ছে প্রতিনিয়ত। ঈদের নতুন পোষাকের বদলে পরতে হচ্ছে শাদা কফিন, তাও আবার ভিজে যাচ্ছে শহীদি খুনে! তবু প্রত্যাশায় থাকি, একদিন সত্যিকার অর্থে ঈদ ধরা দেবে। আর এর সার্বজনীন বিভায় উদ্ভাসিত হবে পুরো বিশ্ব।

কাইয়ুম আব্দুল্লাহ : কবি, লন্ডন থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক সুরমার বার্তা সম্পাদক।

শেয়ার করুন:

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

error: Content is protected !!