রবিবার, ৯ মে ২০২১ খ্রিস্টাব্দ | ২৬ বৈশাখ ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

গোলাম সোবহান চৌধুরী দিপন

একুশের চেতনা : বৈষম্যহীন, অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক সমাজের আকাঙ্ক্ষা এখনো বিরাজমান 



প্রাদেশিক রাজধানী ঢাকা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্র করে বেড়ে ওঠা মধ্যবিত্ত,শিক্ষাজীবি ও ছাত্র সমাজের মধ্যে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণা। উর্দু রাষ্ট্রভাষা হলে বাংলাভাষী শিক্ষিত সমাজ রাষ্ট্রের নানাস্তরে পিছিয়ে পড়বে এবং যৌক্তিক কারনে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ভাষা বাংলা হবে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা । সে বোধ পূর্ববঙ্গের সচেতন অংশকে সক্রিয় করে তোলে । রাজনৈতিক দৃষ্টিতে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ এই উদ্যোগকে দেখল বঞ্চনা, দমন ও আধিপত্য পরিকল্পনার অংশ হিসেবে। ‘রাষ্ট্র ভাষা’ দাবির প্রথম অভিঘাত পরিলক্ষিত হয় শিক্ষিত-মধ্যবিত্ত মহলে । তমদ্দুন মজলিশ আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ সংগঠন করে, ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত আইনসভায় দাবি তোললেন এবং ছাত্রসমাজ সংগ্রামী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয় ।

পূর্ববঙ্গের বৃহত্তর কৃষিসমাজ থেকে উঠে আসা ছাত্রদের উপর বর্বরোচিত হামলা ও ছাত্রহত্যা তখনকার সময়ে ছাত্রদের আশ্রয়দাতা ঢাকার পুরনো বাসিন্দা ব্যবসাদার, বিদৎ সমাজ এবং ঢাকার বাইরে থাকা কৃষি সমাজ মেনে নিতে পারেনি । প্রতিবাদমূখর হয়ে ওঠে জনপদ । কবি সাহিত্যিকেদের লেখনিতে ‘মাতৃভাষার জন্যে জীবনদান’ আত্নপরিচয়ের সূতিকাগার বর্ণনায় উচ্চারিত হয় । গড়ে উঠে স্মৃতির মিনার ‘শহীদ মিনার’ । বাঙালী জাতীয়তাবাদের উন্মেষ রচিত হয় । জাতীয় মানসে রাজনীতি চিন্তায় আত্নপরিচয়ের রাজনীতির বিকাশ অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠে । ভাষাভিত্তিক জাতীয়তার স্বপ্ন জাগরিত হয় । আওয়ামী মুসলীম লীগের ‘আওয়ামী লীগে’ রুপান্তরের ঐতিহাসিক ঘটনা সংগঠিত হয় এবং ‘অসাম্প্রদায়িক’ জাতি পরিচয়ের রাজনীতির গণআকাঙ্ক্ষা মূর্ত হয়ে উঠে। রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রতিক্রিয়াশীল গণবিরোধী সামরিক-বেসামরিক চক্রের নিয়ন্ত্রণ মানুষের আকাঙ্ক্ষার টুটি চেপে ধরে। অর্থনৈতিক বৈষম্য, নিপীড়ন, অগণতান্ত্রিক শাসন-নিষ্পেষণ পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের আর্থসামাজিক বিকাশ রুদ্ধ করে দেয়। মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠে। এসব কেন্দ্র করে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংগ্রাম তরান্বিত হয়। রাজনীতিতে আপামর ছাত্রজনতার মেলবন্ধন ঘটে।

৫২’এর ভাষা আন্দোলন রাজনীতিতে পূর্ববঙ্গের মধ্যবিত্ত ও কৃষি সমাজকে সামনের কাতারে নিয়ে আসে । ‘রাষ্ট্র ভাষা’র আলোড়ন পূর্ববঙ্গের সমাজের দ্বন্ধে মধ্যশ্রেনীর বিকাশের প্রশ্ন প্রধান হয়ে উঠে । গোটা সমাজের মধ্যে আত্ননিয়ন্ত্রের সচেতন প্রয়াশ বেগবান হতে থাকে । যুক্তফন্ট্রের নির্বাচন ও ২১ দফার বিজয়, সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই, ৬ দফা, ছাত্রসমাজের ১১ দফা, ঊনসত্তর এর গণঅভ্যুত্থান, ৭০-এর নির্বাচন, আওয়ামীলীগের সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন, বঙ্গবন্ধুর ৭-ই মার্চের ভাষণ এবং মুক্তিযোদ্ধের মধ্যদিয়ে বাংলাদেশের অভ্যুদয়। বদ্বীপ ভূখন্ডের রাজনৈতিক ইতিহাসে উলম্ফন ঘটে । ১৯৪৭-১৯৭১ কালের রাজনৈতিক সংগ্রামের ইতিহাস সংগঠিত হয় ‘নন কমিউনাল ও ডেমক্রেটিক’ আশা আকাঙ্ক্ষাকে সামনে রেখে ।

বাংলাদেশে এখন ২০২১ সালে একুশের রাজনৈতিক তাৎপর্য তার ঐতিহাসিক স্তর অতিক্রান্ত করেনি । বৈষম্যহীন, অসাম্প্রদায়িক ও গণটতান্ত্রিক সমাজের জোরদার দাবি ও লড়াই এখনো জিয়মান । এখনো সাম্প্রদায়িক রাজনীতির শাখা-প্রশাখা সক্রিয় এবং সমাজস্তরে মানুষে মানুষে বৈষম্য বিরাজমান । সংস্কৃতি এবং চিন্তার ক্ষেত্রগুলোতে বন্ধাত্বতা ও প্রতিক্রিয়াশীলতার প্রাবল্য । অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও অগ্রগতির সাফল্য গতিশীল থাকলেও মানুষের মনন ও চিন্তাজগতে ‘ধর্মাশ্রয়ী’ কুপমন্ডুকতা ও কুসংস্কারচ্ছন্নতা ব্যাপ্তির বৃদ্ধি পরিলক্ষিত হচ্ছে এবং তাতে করে প্রতিক্রিয়াশীল ধর্মান্ধ সাম্প্রদায়িক শক্তির পুনরুত্থানের সম্ভাবনা বাড়ছে যা একটি জাতির অগ্রসরতার পথে প্রতিবন্ধক হয়ে উঠতে পারে ।

মুক্তচিন্তা, অসাম্প্রদায়িকতা,গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও মানবিক সমাজ-রাষ্ট্র গড়ে তুলতে একুশের ঐতিহাসিক তাৎপর্য ও চেতনা চর্চা জোরদার করার আহ্বানের পাশাপাশি সকল মানুষের সুযোগের সমতা ও রাষ্ট্রীয় কল্যাণ প্রাপ্তি নিশ্চিত করার মাধ্যমে শান্তি ও সুখী দেশ গড়ে উঠুক, এবং ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ মহিমান্বিত হয়ে উঠুক সবার জন্যে ।

লেখক: রাজনীতিবিদ ও আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রীমকোর্ট।

শেয়ার করুন:

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

error: Content is protected !!