শনিবার, ১৫ জুন ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ | ১ আষাঢ় ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

পরপারের আরো কিছু যাত্রী।। হাবীব নূহ



১.
২০১৭ সালের ঈদুল ফিতর ছিল জুন মাসের শেষের দিকে। সম্ভবত ২৬ তারিখ।
সাধারণত দুটো ঈদের কোনোটিও আমার পক্ষে hometown সিলেটে করা হয়ে উঠে না। অন্য দেশে থাকায় ঈদ-সময়ে সেখানে যাওয়াটা সহজ হয় না।

দীর্ঘ সময়ের পর, সতেরো সালে তা সম্ভব হয়েছিল। মারহুম আব্বার অসুস্থতার জন্য সেই বছর হঠাৎ সিলেট যেতে হয়েছিল। তাও ঈদের কয়েকটি দিন পূর্বে।

ঐ সময় ঈদ পূর্ববর্তী-রাতের ব্যস্ত সময়ে একটি ফোন আসে। শাহী ঈদগাহের মুতাওয়াল্লী শ্রদ্ধেয় জহির বক্ত ফোন দিয়ে বললেন :
“হাবীব! তুমি নাকি এখন দেশে! তাহলে কাল শাহী ঈদগাহে তোমাকে কিছু কথা বলতে হবে। মানা করা যাবে না। তবে তুমার বিষয়টি তো ইতঃপূর্বে জানা ছিল না, তাই শেজ্যিঊলে (schedule) নাম না থাকায় তুমাকে ভোরে আগেভাগে আসতে হবে। মিস করিও না কিন্তু।”

এ যেন ছিল তাঁর আদেশ। অতঃপর আমার আর কিছুই বলার কিংবা করার ছিল না। অগত্যা ঈদ-সকালে সেখানে আমাকে অপ্রস্তুতই যেতে হয়েছিল।

জহির ভাই, স্বনামধন্য এই ব্যক্তিটি এখন প্রয়াত। সোমবার (৩০ অক্টোবর, ২০২৩) তিনি বিদায় নিয়েছেন, চিরবিদায়।

‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন’
“Indeed we belong to Allah , and indeed to Him we will return.”—(2/156)

২.
শিশু কাল থেকে আমরা আমাদের নিজস্ব এক ঐতিহ্য রক্ষায় অভ্যস্ত ছিলাম। আর তা এই যে, ঈদ-প্রভাতে, ঈদগাহের জামাত শেষে,আব্বার সাথে আমরা ভায়েরা সব এক সাথে কাজিটুলায় বড় আপার বাসায় যেতাম। কারণ, ঈদগাহে জড়ো হওয়া ইমাম,মন্ত্রী,এমপি,মেয়র সহ প্রশাসনিক বড়রা আপার বাসায় তখন আবার নিমন্ত্রণে জড়ো হতেন। তাঁদের এই আপ্যায়নও দুলাভাই’র পরিবারের এক ঐতিহ্য। তাঁদের এ ধারা চলে আসছে আমার তালুই, ঈদগাহের সাবেক মুতাওয়াল্লী, সিলেটের dignified ব্যক্তিত্ব মোবারক বক্ত মারহুমের সময় থেকে।

অতঃপর এই মর্যাদা ধরে রেখেছিলেন তালই-এর পরবর্তী শাহী ঈদগাহের মুতাওয়াল্লী, যিনি ছিলেন তাঁরই চতুর্থ ছেলে ও আমার বড় দুলাভাই এবং সিলেটের prominent ব্যক্তিত্ব—মাহমুদ বক্ত মারহুম।

তারপর, দুলাভাই’-র মৃত্যু হয়ে গেলে, ঈদগাহের মুতাওয়াল্লী নির্বাচিত হন তাঁর বড় ভাই, eminent ব্যক্তিত্ব, মারহুম জহির বক্ত। শ্রদ্ধেয় জহির ভাইও সেই পরম্পরা সোৎসাহে এতদিন বহাল রেখেছিলেন।

কিন্তু, এই আতিথেয়তা আগামীর কোলে বেমালুম তুলে দিয়ে জহির ভাই এখন নিজেই কবরের মেহমান হয়ে গেছেন। ৩১ অক্টোবর সিলেটে তাঁদের private cemetery (family graveyard)-এ তাঁকে সমাহিত করা হয়েছে।

“From the earth We created you, and into it We will return you, and from it We will extract you another time.”—(20/55)

৩.
ঈদ-জামাত-উত্তর তাঁদের এই সম্মিলনে আমাদের নিমন্ত্রণ বা আমন্ত্রণ থাকত বরাবর। এক সময় আমরা (মারহুম আব্বা সহ ভায়েরা) সযত্নে পালন করতাম এই আনুষ্ঠানিকতা। যদিও হালে তাতে শৈথিল্য চলে এসেছে।তবুও, দেশে থাকলে, জহির ভাই’র তাগিদে অংশ নিতে হত। যেদিন আমি ঈদগাহে কথা বলি সেদিনও তাতে এমনি সময় গিয়ে শরীক হয়েছিলাম যখন তিনি সাবেক প্রয়াত অর্থমন্ত্রী মহোদয়ের আতিথ্যে ব্যস্ত ছিলেন। আমাকে দেখেই বলে উঠলেন, “এই জন্যই তো বলি, ঈদ-কালে সময় বের করে দেশে চলে আসতে, আর এ ভাবে কিছু কথা বললে তোমাদের বক্তব্যে মানুষ মুগ্ধ হবে। তাছাড়া তোমাদের এটি দায়িত্বও কিন্তু।”

উল্লিখিত তাঁর ‘মুগ্ধ’ শব্দে আমি প্রীত হলেও তাঁর ব্যবহৃত ‘দায়িত্ব’ শব্দে আমি কিছুটা বিচলিত হই। উদ্বিগ্নের কারণ এই ছিল যে—এই শহরের সন্তান হিসেবে আমি কি আমার ‘দায়িত্ব’ এড়িয়ে চলেছি!

৪.
আমি এই লিখা লিখছি আর চোখের সামনে বিদ্যমান,বিস্তৃত ও অনাবৃত কাঁচের জানালা ভেদ করে পুনঃপুনঃ আমার নজর পড়ছে বাইরের পরিবেশের দিকে।

ইংল্যান্ডে এখন শীত-পূর্ব autumn (শরৎকাল) মরসুম চলছে। পাতা-ঝরা গাছের পাতা ঝরা দিনগুলো পার হচ্ছে। গাছগুলোর পাতা প্রকৃত রং থেকে অপরাপর রং-এ রূপান্তর হওয়ায়, দৃশ্যমান দিগন্ত অবধি যেন ভিন্ন এক বর্ণীল সাজ সেজেছে। তবে পীতবর্ণের প্রাধান্যের কারণে সর্বত্র স্বর্ণাভ এক প্রভা প্রসারিত হতে চলেছে।

আজকের দিবস—ক্ষণে ক্ষণে বৃষ্টি ঝরা দিন। আর লন্ডনে এখন পড়ন্ত এই বিকেলে কিছুক্ষণ পূর্বে ক্ষণিকের তরে রোদের আভা ছড়িয়ে পড়েছিল। কিন্তু পরক্ষণে মেঘ ছাপিয়ে গেছে গগনে। সূর্য অস্তাচলে যেতে আর বেশি দেরি নয়।

বিস্ময়কর ব্যাপার হল, মৌসুম গাছ আর প্রকৃতির সাথে মানুষের জীবনের (আংশিক হলেও) কি অদ্ভুত মিল আছে। ঋতুর পরিবর্তনের মত মানুষের জীবনও অবস্থান্তর হতে থাকে। পাতা ঝরার মত কখনো চট করে মানুষের জীবন ঝরে যায় অতঃপর এক সময় মাটিতে মিশে যায়।

যেমন, বিগত শুক্রবার রাতে আমাদের একমাত্র মামী (৭২) যখন সবকিছু গোছায়ে, ঘুমাবার জন্য বেডে শুয়েছেন মাত্র, অকস্মাৎ তিনি (সাডেন কার্ডিয়াক ডেথ) চির নিদ্রায় চলে গেছেন।

সম্প্রতি, আমাদের আত্মীয়দের থেকে আমরা তাঁদেরকে (মামী এবং জহির ভাই) হারালাম। আমরা তাঁদের জন্য মাগফিরাত, রাহমাত এবং জান্নাত কামনা করছি।

“اِنَّا لِلّٰهِ وَ اِنَّاۤ اِلَیۡهِ رٰجِعُوۡنَ”
“নিশ্চয় আমরা আল্লাহর জন্য এবং নিশ্চয় আমরা তাঁর দিকে প্রত্যাবর্তনকারী।”—(কুরআন : ২/১৫৬)

৫.
গাছের মত মানুষ নিজেকে, পরিবারকে এবং অন্যদেরকে ছায়া ও আশ্রয় দিতে দিতে একসময় তাঁকেই চলে যেতে হয় মাটির ছায়ায়, মাটির আশ্রয়ে।

প্রোথিত বীজ থেকে গাছ যেমন অঙ্কুরিত হয় তেমনি জীবন তামাম হলে, মৃতদেহ মাটিতে (কবরে) পোঁতে রাখা হয় পুনরুত্থান দিবসে সমুত্থান হবে বিধায়।

“মাটি থেকে আমি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি, তাতেই আমি তোমাদেরকে ফিরিয়ে নেব, আর তা থেকে তোমাদেরকে আবার বের করব।”—(২০/৫৫)

সেহেতু :

সবার সেদিনটি সুখকর হবার জন্য এখনই যেন সবাই সুচিন্তিত সুপথ ধরতে পারি…

৬.
আমাদের দুজন আত্মীয়ের বিয়োগে আমরা যেমন এখন শোকাহত। ঠিক তেমনি, এ সময়ে আমাদের ধর্মীয় ঘনিষ্টদের জন্যও বোধকরি সবাই মর্মাহত।
যাদের আপামর জাতি আজ একটি প্রবিত্র ভূমিতে প্রতিমুহূর্ত নির্বিচারে অত্যাচারিত ও ভূলুন্ঠিত হচ্ছে। সভ্য-বিশ্ব নির্বিকার শুধু দেখেই যাচ্ছে।
তাঁদের জন্য স্রষ্টার কাছে আপাত আবেদন করা ছাড়া আর তো কিছুই আমরা করতে পারছি না। যদিও মুসলিমদের এতটা অপারগ আর নির্লিপ্ত, এবং অপদস্থ আর অপমান হওয়ার কথা ছিল না।

যাহোক :

اِنۡ یَّنۡصُرۡکُمُ اللّٰهُ فَلَا غَالِبَ لَکُمۡ ۚ وَ اِنۡ یَّخۡذُلۡکُمۡ فَمَنۡ ذَا الَّذِیۡ یَنۡصُرُکُمۡ مِّنۡۢ بَعۡدِهٖ ؕ وَ عَلَی اللّٰهِ فَلۡیَتَوَکَّلِ الۡمُؤۡمِنُوۡنَ
—(আল-কুরআন : সূরাহ-৩,আয়াত-১৬০

লেখক: মুফতি

শেয়ার করুন:

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন