বৃহস্পতিবার, ৮ ডিসেম্বর ২০২২ খ্রিস্টাব্দ | ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

আবু সুফিয়ান খান

গ্রন্থালোচনা : একটি ভাষণ একটি দেশ



গ্রন্থালোচক কবি আবু সুফিয়ান খান (ডানে) ও কাব্যগন্থের লেখক কবি রাসেল আশেকী

“আধ্যাত্মিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার ভিতর থেকে যিনি প্রকাশ করেন স্বজাতির হাঁড়ি ও নাড়ির খবর, সৃষ্টি করেন ক্ষয়ে যাওয়া সময়ের ঘুরে দাঁড়াবার শক্তি, তরুণ প্রজন্মের এগিয়ে যাওয়ার সাহস- তিনি আমাদের প্রিয় কবি রাসেল আশেকী।” – বলেছেন বইটির প্রকাশক।

তিনি আরও বলেছেন-, “বাংলা ভাষার গণনন্দিত কবিকণ্ঠ রাসেল আশেকী নব্বই দশক থেকে কবিতাঙ্গনে আলোড়ন সৃষ্টিকারী এমন এক প্রতিভা যিনি দশক শতক ছাপিয়ে এ সহস্রাব্দের বাংলা কবিতার প্রাণপুরুষ, বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান কবি।
তাঁর কবিতা মা মাটি দেশ ও মানুষের অনিঃশেষ এক অন্তর্কথন। সমকাল সমজীবন ও সমপৃথিবী তাঁর শক্তিমান-উচ্চারণে পায় নতুন গতি এবং অনন্তের আলোকদিশা।”

“একটি ভাষণ একটি দেশ” কবিতার বইটি বাস্তব রাজনৈতিক ও প্রকৃতজ প্রজ্ঞা সম্পন্ন বাংলাদেশ ও বাঙালি জাতির বীত ব্যঞ্জনাময় ইতিবৃত্তায়ন ঘটনাচিত্র সম্বলীত একটি চৌকষ গ্রন্থ। কবি যেখানে তার বইয়ের প্রথম “একটি ভাষণ একটি দেশ” কবিতায় বলেছেন-
# “এই মাটি সোনা হবে
মাটির মানুষ সোনার মানুষ হবে
সোনার নৌকা পবনের বৈঠা হাতে
আসবে সোনার মানুষ, শুনবে নেতার কথা
নেতা আসবেন, নেতা আসবেন
শোনাবেন তার তার অমিয় ভাষণ
ক্ষয়ে যাওয়া সময়ের ঘুরে দাঁড়ানোর
অভয় প্রেম, মানুষের হৃদয়ে পেতে আসন
নেতা আসবেন, নেতা আসবেন
শোনাবেন তার অমিয় ভাষণ

* * * * * * * * * * * * * * * * *

নেতা আসছেন চির দুঃখের ভূমিতে ফুল ফোটাতে
ফোটাতে
সহস্র যুগের অজস্র আলোর তোড়ে প্রদীপ্ত সূর্যের
মতো
বাংলার আকাশ জুড়ে
গণসমুদ্রের মঞ্চে

* * * * * * * * * * * * * * * * *

জেনে রাখো, এ বসন্ত বৈশাখের সমুদয় নির্যাস-
এই দেশ
এই মাটি
এই জাতি
এই ইতিহাস
ঘামের ঘ্রণে ঘ্রাণে আকাশ ছোঁয়া
সেই মহমানুষের ইতিহাস, যে ইতিহাস
নেতার সাথে জনতার- জনতার সাথে নেতার
আত্মার সংযোগে মহামিলনের স্রোতে
ভেসে ওঠা ইতিহাস ;
সাতই মার্চ রেসকোর্স ময়দান থেকে
জন্ম নেয়া ইতিহাস-

যেখানে মহান নেতা জনসমুদ্রে তুমুল তুফানে
ছাপিয়ে পৃথিবীর সব কণ্ঠ, উঁচিয়ে হিমালয় সম
তর্জনী
পেশ করলেন জীবনের শ্রেষ্ঠ মর্মবাণী
“এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রা
এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম
জয় বাংলা”

# কবিতার নাম : “শেখ হাসিনা’র প্রতি” এখানে কবি
বলেছেন-,
“কী বিশেষণে বিশেষিত করব আপনাকে
আপনি তো সব বিশেষণের ঊর্ধ্বে বিশ্বমানবী।
পথের দূর্বাঘাসও আপনাকে চেনে
আপনাকে চেনে তালগাছে ঝুলে থাকা বিরল
বাবুইপাখি
খুব বেশি চেনে ভোরের কাক ও কোকিলের চোখ
আর দোয়েলের শিসে দোল খাওয়া ঝিঙেফুল
মৌমাছি।”
এখানে কবি হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ সন্তান জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান’র কন্যা আজকের প্রধানন্ত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনা, মাদার অব হিউম্যানিটিকে বলেছেন-, ‘বিশ্বমানবী’, – শব্দটিকে যদি এইভাবে ভাঙি= বিশ্ব+মা+নবী, তাহলে দেখা যায় তিনি মহামানবী। যদিও ইসলামে কোন নারী নবী নাই। তবে মা ফাতেমা, তাপসী রাবেয়া বশরী, হযরত আবু শাঁমা’র স্ত্রীর মতো মহামানবী আছেন। এখানে কবি কী তেমন কিছু বুঝাতে চেয়েছেন :
‘আপনি সেই রত্নগর্ভের সুযোগ্য পরমা
বিমূর্ত থেকে মূর্ত যুগের আলোকবর্তিকা।’
কবি আরো বলেছেন,-
“এখনো আপনি অমল পুরানের সেই দুর্গতিনাশিনী
আর ইতিহাসের নেফারতিতির মতন স্বজাতির মুখে

* * * * * * * * * * * * * * * * *

যেভাবে আপনার আত্মার অশ্রুতে-ভরা নদীও
জেগে ওঠে
পৃথিবীর সবুজে, ক্ষমাও হতে থাকে ভালোবাসার
বিকল্প শক্তি!
কেননা, আপনার জন্ম একটি নতুন সময়ের ইঙ্গিত-
পিতার মহাস্বপ্নের মুক্তি।

# কবি “স্বাধীন কবিতা” নামে অনেকগুলো বাণী
লিপিবদ্ধ করেছেন,-

যার বাবা সত্য মা পবিত্র
তার সম্মান ও স্বর্গ কোনটাই খুঁজে হয় না

১১
ভালোবাসা শেষ পর্যন্ত মিলন এবং বেদনা

১৩
মানুষ পড়লে পৃথিবী পড়া হয়
মানুষ চিনলে স্রষ্টাকে চেনা হয়

১৪
শেখ হাসিনার কর্মগুণের নাইরে শেষ
উন্নয়নের নতুন মডেল বাংলাদেশ

১৫
একটি ভাষণ একটি দেশ
বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ

উদৃতিগুলোতে কবি তার বিচিন্তিত ভাবনাগুলো সুন্দরভাবে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছেন। কবিকে সেজন্য বাণী প্রসূতির অমৃতের পুত্র বলা যেতে পারে।

# বইয়ের শেষ কবিতাটি :
“মনে পড়ে সেই মেয়েটির কথা”
“মনে পড়ে সেই মেয়েটির কথা যে আমার গান
গেয়েছিলো
হাজার নর্দমাভরা একটি ঝিলপাড়ে দাঁড়িয়ে
কী মধুর সুরে….
মনে পড়ে সেই মেয়েটির কথা
যার গড়ন ছিলো পিছনে রাখা আয়নার মতো
যেন বারবার ঘুরে দেখা হৃদয় মিনার।

* * * * * * * * * * * * * * * * *

ভেসে উঠছে ভেসে উঠছে সেই মেয়েটি যে পাখি
হয়ে আসে
আর গান হয়ে উড়ে যায় উড়ে।

কবি এখানে তার অন্তর্নিহিত প্রেমসত্বাকে পিঙ্কপ্রিয় রূপে ব্যাক্ত করেছেন। এতে বুঝা যায় কবি পার্থিব ভালোবাসায় দুঃখ কান্না বিরহের শীতল কষ্ট অনুভব করেন।

বিচিত্র বিষয় ও ভাব সম্বলিত অতিন্দ্রীয় স্পর্শকাতর ধীমাত্রিক গদ্য কবিতা বিনির্মাণে চলমান একনিষ্ঠ লেখক কবি রাসেল আশেকী কবিতা রচনায় তিনি যুগের বাঁক বদল ধারায় প্রচেষ্টা চালিয়ে আসছেন, তার লেখা কবিতা গুলো গদ্য রীতি-শৈলী ছন্দ চাল পর্ব বিন্যাস করে সুললিত ছন্দে রচনা করেছেন। এবার অমর একুশে বই মেলায় প্রকাশিত “একটি ভাষণ একটি দেশ” বইটির কবিতাগুলো পড়লেই পাঠক অবগত ও পরিচিত হবেন শব্দ চয়নের ব্যাপকতা ও কলা কৌশল সম্পর্কে। সমাজের বৈচিত্র্যময় বিষয় ও প্রকৃতির বাস্তব ঘটনাবলী প্রণয়ন করে কবি তার ছত্রাবলী সৃষ্টি করেছেন।

প্রিয় পাঠক লক্ষ করেছেন কবি তার কাব্য রচনা শৈলী নির্মাণে কোনরূপ কার্পন্য করেন নাই, ঋদ্ধহস্তে উপমা, রূপক কাব্য উপাদান ব্যবহার করেছেন, শব্দ প্রয়োগে তিনি একই শব্দ পাশাপাশি দ্বিত্য ব্যবহার করে শব্দের ঝংকার ও আবেগ প্রকাশ করেছেন যথাযথভাবে। তবে আধুনিক কবিতার শব্দ সংকোচনের বিধান প্রয়োগ করতে পারেন নাই। বাক্যর অনুগামীতায় কিছুটা অসংগতি পরিলক্ষিত হয়।
কাব্যরীতি অনুযায়ী অপ্রয়োজনীয় বিরাম চিহ্ন ব্যবহার করেন নাই, যা বর্তমানে আধুনিক কবিতায় মানায়।

গদ্য কবিতার ধারাবাহিকতা ঠিক থাকলেও পর্ব বিন্যাসে যতি, ছেদ, চাল আরো মাত্রাবৃত্তিক হওয়া শুদ্ধ ছিলো।

চমৎকার উপমা, অনুপ্রাস, উৎপ্রেক্ষা, রূপ-রূপক, ব্যঞ্জনাময় শব্দের বিন্যাস, কাব্যিক ছন্দ-পর্ব-রীতি-শৈলী ও সরল ঝংকারে সাবলীল বাক্য নির্মাণ, যাথোপযুক্ত উদাহরণসহ বস্তুনিষ্ঠ তথ্য ও উপাত্ত সম্বলিত এবং অজানা অনেক খুনসুটির অবতারণামূলক দেশাত্ববোধ ও দেশপ্রেম অন্তরালে প্রেম রসময় সহজপাঠ্য, প্রাঞ্জল ভাষায় লেখা ৩৩ টি কবিতা।
লেখকের মেধা ও মনন সুপরিচ্ছন্নভাবে পরিস্ফুটিত হয়েছে।

কবিতাগুলো সহজ পাঠ্য ও বোধে গ্রাহ্য । পড়ার জন্য আলাদা সময় করে নেয়া প্রয়োজন নাই।

সব কবিতাই গদ্য রীতি শৈলীতে লেখা : গদ্য রীতির কবিতাগুলোও হোঁচট খাওয়ার মত নয়। তবে পুরোপুরি আধুনি নির্মাণ শৈলী কবিতার গায়ে বসাতে কবি চেষ্টা করেছেন। কিন্তু উত্তর আধুনিক করতে ব্যর্থ হয়েছেন, কারণ : উত্তর আধুনিক কবিতায় অনন্তগামী ইন্দ্রীয় গ্রাহ্য ভাব ও বিষয় থাকতে হয়, আমার কাছে তা প্রতিপন্ন হয় নাই, এবং রীতি-শৈলীতে অব্যয় পদের ব্যবহার হয় না, যেমন ; তো তা এবং যদি তবে নতুবা অথবা মতো জন্য যেমন তেমন বরং ইত্যাদি। কিন্তু কবি তার কবিতায় এগুলো প্রয়োগ করেছেন। কবি তার প্রচ্ছন্ন বীর্যবান যৌবনের স্ফূরণ কবিতার সরল রেখায় সমস্ত কবিতাকে এক কক্ষে রেখে বিভিন্ন ভাব ভাবনায় ছড়িয়ে বিধৃত করেছেন।

অন্যদিকে একই শব্দ বারবার ব্যবহার করায় বুঝা যায় শব্দ ভাণ্ডারে খাঁটতি আছে।

গ্রন্থটি পাঠান্তে কবিতা কেমমন হয়েছে, তাও পাঠক অনুধাবন করতে পারবেন। কবি লিখতে যেয়ে ইংরেজি শব্দের প্রভাব এড়াতে পারেন নাই, বেশ কিছু ইংরেজি শব্দ কবি সুকৌশলে সফল প্রয়োগে সমর্থ হয়েছেন এতে বাংলাভাষার গর্ভে শব্দভাণ্ডার বৃদ্ধি পেয়েছে । এটা তার বাংলা ভাষার প্রতি অগাত আনুগত্যতা বিনম্র শ্রদ্ধা প্রকাশই বোঝায়। এখানে কবি তার শব্দ প্রয়োগের বাড়তি দক্ষতা দেখিয়েছেন। যেমন ‘স্যালুট, প্যান্ট ‘ এবং “কবিতার বাড়ি” নামক কবিতাটির প্রথম অংশ সরাসরি ইংরেজিতে তুলে দিয়েছেন :
“For god’s sake
Earth is Mother
Mother is Freedom
Freedom is Heaven
Heaven is Power of People

* * * * * * * * * * * * * * * * *

exposing love and faith
true and justice
for peace.

বইটি সকল মানুষের পাঠযোগ্য ও সংগ্রহে সংরক্ষণযোগ্য।

বইটির নাম করণ হয়েছে প্রথম কবিতার নামে, বইটির নামকরণের সার্থকতা কবিতাটি পড়েই পাঠক ব্যক্ত করবেন।
তবে কবিতাগুলোর নামকরণ করা হয়েছে একাধিক শব্দ সমন্বয়ে। নামকরণের ব্যাপারে কবি কোনো শব্দ সংকোচন করেন নাই।

এবং
আবেগময় কিছু শব্দ অহেতুক কবিতায় প্রয়োগ হয়েছে সে সম্পর্ক জানা থাকা আবশ্যক। যেমন —
# “তো” আবেগ প্রকাশ করতে যেয়ে আসল কথা বলতে
না পেরে তো তো তো করে অর্থাৎ তোতলামী থেকে
“তো” ধ্বনির উৎপত্তি।
# “গো” এটা পশ্চিম বঙ্গের একটি কথ্য আবেগী ধ্বনি যেমন-
হ্যাঁ গো, কেমন আছো গো, ইত্যাদি
# “রে” এটা প্রচলিত সঙ্গীত ধ্বনি, সা-রে-গা-মা এর ধ্বনি। যেমন- ও, পাখি রে—-, মাঝি বাইয়া যাও রে —-।
এ রকম আরও আছে।
তাই এসব অপ্রয়োজনীয় আবেগী ধ্বনি কবিতায় প্রয়োগ করা অবাঞ্চনীয়।

বেশ কিছু বানান বিভ্রান্তি পরিলক্ষিত হয় তবে ছাপাত্রুটি নাই। বই’র শেষে একটি নির্ঘন্ট বা বানান সংশোধনী থাকা আবশ্যক ছিলো।

বইটি উৎসর্গীত হয়েছে :
“আমার উত্তর প্রজন্ম
যারা সংগ্রামের মধ্যেও মাথা উঁচু করে দাঁড়ায়”

৪ ফর্মার বই, সুন্দর আকর্ষণীয় চার রঙের প্রচ্ছদ, প্রচ্ছদে আদিগন্তোন্মুখ পাখির ডানা সংযুক্ত উর্ধ্বমুখী ধ্বনী নিসৃত চোঙার ছবি।
মজবুত বাঁধাই এবং দ্বিতীয় ফোল্ডারের কবির আজানু প্রলম্বিত ছবি, সংক্ষিপ্ত জীবনী ও প্রাপ্তিসমূহ। ৮০ গ্রাম কাগজ, ১/৮ সাইজ। মূল্য টাকা ২০০.০০ মাত্র।

প্রথম প্রকাশক : অমর একুশে বইমেলা ২০১৮।
প্রকাশক: প্রথম পালক, ১৫১/৭ গ্রিন রোড, ৭ম তলা, ঢাকা-১২০৫, ফোন : ০১৭৮২৬৯০৪৮৬

প্রচ্ছদ : দেওয়ান মিজান।

স্বত্ব : রাসেল আশেকী।

কবির কাব্যচর্চা অব্যাহত থাকুক।
বইটির বহুল প্রচার ও সফল বিক্রয় কামনা করি।

শেয়ার করুন:

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

error: Content is protected !!