রবিবার, ২৬ জুন ২০২২ খ্রিস্টাব্দ | ১২ আষাঢ় ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

কবি ও কবিতা ।। শাহ শামীম আহমেদ



শাহ শামীম আহমেদ

সংক্ষিপ্ত কবি পরিচিতি :

এই সময়ের তরুণ কবিদের মধ্যে শাহ শামীম আহমেদ খ্যাতিমান। আশির দশকের শেষের দিকে লেখালেখি শুরু হলেও নব্বইয়ের দশকে এসে পাঠকের সাথে তাঁর পরিচয় গড়ে ওঠে। এক সময় সিলেটের সাহিত্যবিষয়ক আড্ডাগুলোর এক উজ্জ্বল মুখ এই তরুণ কবি লিখে চলেছেন লিটল ম্যাগাজিনসহ দেশ-বিদেশ থেকে প্রকাশিত বিভিন্ন দৈনিক ও সাপ্তাহিকের পাতায়।

কবিতায় শাহ শামীম কখনো না-পাওয়ার বেদনায় চঞ্চল-অবুঝ প্রেমিক; আবার কখনো-বা সমাজ ভাবনায় সচেতন ও বিবেকবান। প্রায় তিন দশক ধরে লিখে গেলেও ’জলরঙা দিন’ ই তাঁর প্রথম প্রকাশিত কবিতার বই। গ্রন্থভুক্ত সব কবিতাই বিভিন্ন লিটল ম্যাগাজিন, দৈনিক ও সাপ্তাহিকে ইতোপূর্বে প্রকাশিত। ’হৃদি’ নামক প্রতিনিধিত্বশীল একটি নিরীক্ষাধর্মী লিটল ম্যাগাজিনের সম্পাদকও তিনি।

কবিতা চর্চার পাশাপাশি শাহ শামীম আহমেদ প্রগতিশীল রাজনীতির সাথে জড়িত। নব্বইয়ের দশকের মধ্যভাগে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন করতে গিয়ে কিছুদিন কারাবরণও করেন। লেখাজোকা ছাড়াও ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে তিনি স্বাতন্ত্র্যে উজ্জ্বল হয়ে উঠছেন ক্রমশ।

বর্তমানে যুক্তরাজ্যে বসবাসরত এই তরুণ কবি জন্মগ্রহণ করেন ১৯৭২ সালের ১০ অক্টোবর, সিলেট জেলার বিশ্বনাথ উপজেলাধীন ধর্মদা গ্রামের পীরবাড়ি।

শাহ শামীম আহমেদ এর কয়েকটি কবিতা –

তৃষ্ণাগুলো করেছি সষ্ণয়

কয়লা খনির ভেতর অন্ধকারে পড়ে আছে কালো আত্মা
কতকাল এ শ্রমিক মন ঘষে ঘষে জ্বালিয়েছি
অজ্ঞতার গহীন অন্ধকার তেকে আলোর টানেল ধরে করেছি হীরের সন্ধান

অথচ বাইরে জ্বলছে ঐ নক্ষত্রের ফুল
রোদের অক্ষওে সতীর্থ সময় লিখে নিজস্ব ঠিকানা

ঝিনুকের যন্ত্রনাটুকু কতবার পুষেছি যে বুকের গভীরে
সকল রহস্যথিম পড়ে আছে স্তুপিকৃত বোধের দুয়ারে
ভিখেরীর সমস্ত সঞ্চয়ের মতো এই অকিঞ্চিত সৃষ্টিটুকু
দু:খের মতো আমারই নিজস্ব
আনন্দের শুভ্রভ্রুণ স্বপ্ন-রেণু গড়েছি শিল্পের শহরে
পূর্ণগ্রাস তরল আনন্দ আর বৃষ্টিভেজা রমণীর গা
ঠোঁটে ঠোঁট রাখা চুম্বনের অমৃত স্বাদ যা কিছু মাতাল করে,যা কিছু অদেখা. . .
বোধের করতলগত এই তৃষ্ণাগুলো করেছি সষ্ণয়।

সেইসব আলোকিত দিনে

হিরন্ময় সেইসব আলোকিত দিনে
অবুঝ স্বপ্ন নিয়ে জ্বলে উঠতাম বারুদের মতো
চমৎকার সব রাত্রিকে জাগিয়ে দিতাম আলোর ঝলকানিতে,
আজও ইচ্ছে করে পৃথিবীকে উজ্জ্বল করে দিই সেইসব রাত্রির মতো, ইচ্ছে হয়
চমৎকার আগুন হাতে নিয়ে নেমে পড়ি
বিশুদ্ধ কবিতার শহরে।

কেবলই ভাসছি বাসনার বেলুনে উড়ে,
বৈপরীত্য দুই পায়ে গড়েছে শিকল।

রাত্রির কাতরতা, কালো কষ পান করে
কবে যে হারিয়েছি হিরন্ময় অতীত কবিতার শহরে
নিজেও জানি না।

দহনের অশ্রু

বেদনার পাথর ফুঁড়ে যদি বের হয়
দহনের অশ্রু-
তবে নায়েগ্রার বুকে কত জল ঝরে
তা জানবে কি কেউ কভু?

পাথরের ভাষায় হিসেব গুনি, নায়েগ্রার জলরাশি
শত পাথরে বুকখানি চাপি,
তবু আমি হাসি।

অবিনশ্বর এক সৃষ্টিময়তার পদ্য

দুঃসাধ্য সে তো স্বর্গ নয়- মর্ত্য ও পাতালের সব খুঁজে আছে
দুর্গম-গিরি-গুহা-অরণ্য. . .

তেত্রিশকোটি আলোকবর্ষ দূরে অন্ধকারের কালো কষও গলে যায়,
রোদের সোনালি রঙ ফিকে হয়ে আসে-
বায়ুর শরীরজুড়ে বেঁচে থাকে জীবনের কোষ,
হঠাৎ লাফিয়ে ওঠেন অলৌকিক পুরুষ।

সৃষ্টি-ভ্রুণে আলোকিত বেজন্মা পৃথিবী
বীর্যের গলিত ধারায় বহমান মৃত্যুহীন অমর এক শৈল্পিক শূন্যতায়. . .

অস্তিত্বকে ক্রমশ পোষ মানাতে থাকি,
অস্তিত্ব অবয়ব আর আত্মায় চলে এক নীরব সংঘর্ষ;
দ্বৈরথে কোন দিন দু’জনেরই হার হয়
কোনো-কোনো সময় অবিনশ্বর এক সৃষ্টিময়তা
আমাকে পরিভ্রমণ করিয়ে আনে
লক্ষ-কোটি আলোকবর্ষ চর্মচোখের সৌন্দর্যকে ম্লান করে
সেখানে জলের জীবনও দেখা যায়।

কোনো কোনো মধ্যরাতে গোলাপি বক্ষ নেড়ে
নগ্ননারী মত্ত হয় নিপুণ ক্রীড়ায়. . .
সারা রাত সাঁতরে উঠি, শীতল স্নান,
পাশ ফিরে চেয়ে দেখি সবকিছু মিশে আছে শূন্য শূন্যতায়।
বায়ুর শরীরজুড়ে বেঁচে আছে জীবনের কোষ।

মানুষ ঈশ্বর হলে

যাপিত জীবন ভেঙে চূর্ণ করি, অনিন্দ্য শিহরণে কেঁপে ওঠা সৃষ্টিমুল-
নারীর জরায়ূ ছাড়া স্থাপত্যরীতির আশ্চর্য নির্মাণ,
বিশ্বাসের শ্বাশত শরীর ও মৃত শব্দেরা পেয়ে যায় অলৌকিক প্রাণ।
হৃদয়ের কোষাগারে জমে থাকা তৃষ্ণার মেঘ স্বপ্ন ও আশার হোমানলে তোলে,
মেধার কৃষ্ণবিবরে পড়ে-থাকা সৃষ্টি-ভ্রুণ জল ও আলোর স্পর্শে।

ঈশ্বরের সে এক অলৌকিক নির্মাণ।

দ্বিধা ও দ্রোহেরা জ্বলে
শব্দের নদীও পেয়ে যায় অলৌকিক চাকা।
অতপর ভাঙচুর কেবলই ভাঙ্গা গড়ার উৎসব।

সৃৃষ্টিমূলে জেগে ওঠা মূর্তিমান মানুষ-
মানুষ স্রষ্টা হয় ঈশ্বরের প্রতিনিধি বলে।
মানুষ ঈশ্বর হলে অধীশ্বর থেকে যান প্রশ্নাতীত।

মে’র রোদমাখা ভোরে

আনন্দাশ্রু
চুমো খায় ৯ মে’র রোদমাখা ভোরে
হৃদনদে আলোজল শব্দতৃষ্ণার অমল সষ্ণয়
চোখে আনন্দাশ্রু-ঐশী প্রহরে
অভিষেকে সিক্ত হবে কবির জন্মদিন-
এ কথা ছিল না লেখা প্রথম প্রহরে

তোমাকে সিক্ত করি
বুকের গ্লাসে রাখা মধুজল ঢেলে।

ঈশ্বরের স্বগতোক্তি

ঈশ্বর স্বগতোক্তি করে আমি অবিনাশ,
আমি তার করি না বিনাশ।

প্রশ্নমনস্ক এই মন সাতটি স্বর্গ ও আটটি নরক ভেঙে
বার-বার ডেকে আনে সমূহ বিনাশ!

স্বর্গ মানেই কি লোভ? গাধার সামনে মুলো?
নাকি বিশ্বাসের সোনালি মাঠি?
নরক মানেই কি ক্রীতদাস? পরজন্মে কুকুর?
কষ্ট ও অসম্মানের সাথে বসবাস?
নাকি কলু-ঘরে পাক খাওয়া বোধের ভ্রুণ?
কেবলই পেরকুটি অন্ধ হাসফাস,
না-খোদা বিশ্বাসের কুষপুত্তলিকা দাহ দিই
মনে মনে সাতবার খোদার কসম খাই-
কেবলই ভ্রম হয় ভ্রম ও বিনাশ খেলে চত্বর মায়ায়
অভয়ের সোনালি আগুনে সেকি বিশ্বাসের নিরন্ন সওদা
সোনার মোহর ভরা শিল্পের শুভ্র কারুকাজ
আমি তো জানি না তার অতল গভীর

ঘৃণার অর্ঘ দেব সাতটি পাথর;
আমি ধারণ করেছি তাকে আমার ভেতর।
দোআঁশ মাটি গড়া এমনই অপাত্রে
বিশ্বাসের কাঠখড় কুরআন ও হাদিস
বোধের উনুনে পুড়াই সকল কিয়াছ
আমার ভেতরে তার বসতভিটা
প্রেম ও বিরহে গাঁথা জীবন-সন্যাস,
আমি ধারণ করেছি বুকে ‘কুন ও ফাইয়া কুন’, নামক
সৃষ্টির স্রষ্টা ও তার অভিজ্ঞান,

ঈশ্বর স্বগতোক্তি করে- আমি অবিনাশ,
আমি তার করি না বিনাশ।

এবারের ঈদে

এবারের ঈদে তোমাকে দেবো দুর্লভ কিছু ;
কি দেবো তোমাকে?
হীরের আঙটি, নীলার পাথরে গড়া দুল
কোহিনুর হীরক খণ্ডে গড়া মাথার মুকুট-
কী পেলে খুশি হবে তুমি?

এবারের ঈদে তোমাকে দেবো উজাড় হৃদয়ে ভালোবাসা-
ওড়নার বদলে দেবো আবিরের রঙমাখা সমস্ত আকাশ
টিপের বদলে দেবো পূর্ণিমার চাঁদ
কিংবা হিরন্ময় রৌদ্র-উজ্জ্বল সকালের সূর্য
মেঘমালা আকাশ দেবো, দেবো উড়ন্ত বলাকা

সাতরঙা রঙধনু সেতু হবে অবেলার
আর মেশাবো জল পৃথিবীর জলে-
নিরাকার জলে, সিক্ত স্নানে
পবিত্র হবে তুমি প্রতিদিন সকাল
এবারের ঈদেও ঠিক তাই হবে।

শুরুতেই রেখেছি শরীরে স্বপ্নমাখা সেন্টের শিশি-
সেও তো শুধু তোমার জন্যে।

মনে পড়ে মধু সন্ধ্যার স্মৃতি

সেই মধু সন্ধ্যার স্মৃতি মনে পড়ে;
সাথীদের নির্জন বারান্দায়
কলিংবেল বেজে গ্যালো মধুর-মর্ধু
আকাক্সক্ষাপর তীরজল
হৃদনদে গলে পড়ে প্রত্নরোদ
তোমার পায়ের শব্দে
হৃদয়ের তারগুলো বেজে যেন হাজার সরোদ-

এই ফাঁকে গচ্ছিত রাখি
তোমার মুগ্ধ ঠোঁটে আমার চুম্বন।

প্রথম চুম্বন যেন ঘোরলাগা সুখের বিদ্যুত।
তোমার স্পর্শছোঁয়া অনিন্দিত আমার প্রহর।

আমি আর ফিরবো না প্রতারক শহরে

পেরিয়ে পাথর দিন          আমি গেছি
হাকালুকি হাওর জল       নদীর কিনারে
নাগরিক রাত- নিয়ন আলোয় দোলা নতর্কীপ্রহর
বিয়ারের ফেনা-গণিকা নদীর স্বাদ- মদিরা শহর
আনচান করে দেয় আমাদের আলোময় দিন।

ছিলট সন্যাস   বাবার চরণধূলিমাখা দেহময়।
পিতৃজলে পূণ্যস্নান           করে শ্রীচৈতন্যমন. . .
আমার অরণ্যদিন      কার্পাস তুলোর মত. . .
উড়ায় সন্যাস
ও মন, পাখি-মন থাম . . .
ক্রৌষ্ণবিদ্ধ হও             বাল্মীকি জাগুক প্রাণে
কঙ্গোচিনা ফুলের মদ       গঞ্জারমালা পরা
কবরী-বালিকার প্রেমে
আদিবাসী যুবকের মন          ধ্রুপদী নাচের মতো-
নাচবে হাওয়ায় কার্পাাসমহল
নিত্যগীতে মণিপুরী পূজাপর্ব পাঠ সাঙ্গ হলে
তাড়িরসে সিক্ত হবে মদিরা অধর।
পিয়াইনের জলে-ভাসা        আমার মুগ্ধ দিন
নৌকার পাটাতনে বসা      খাসিয়া রমণীর
বুনোফুলের মতো দেহমদ-
জলের তরঙ্গছোঁয়া হাসিতে মাতাল হবো
ঘবো মুরং যুবতীর পিঠে- ঝোলা দুধের ছাওয়াল।
আমার অরণ্যদিন যায়
পরকীয়া রমণীর ঘরে. . .
জাফলং পাথরের কসম. . . আমি আর ফিরবো না-
ফিরবো না প্রতারক শহরে।

কবির সাথে যোগাযোগ: shahshamim@hotmail.co.uk

শেয়ার করুন:

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

error: Content is protected !!